আকবরের রাজপুত নীতি [Akbar’s Rajput policies]

 

আকবরের রাজপুত নীতি সম্পর্কে কি জানো? এই নীতি কতদূর সফল হয়েছিলো?

[What do you know about Akbar’s Rajput policies? How far was this policy successful?]

সূচনা:

মধ্যযুগের ভারতবর্ষের ইতিহাসে মোগল সম্রাট আকবর বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর রাজপুত নীতির জন্যই। আকবরের রাষ্ট্রনৈতিক প্রতিভার পরিচয় তাঁর রাজপুত নীতির মধ্যে বিশেষভাবে দেখা যায়। এই প্রতিভাবান, উদারচিত্ত সম্রাট একথা বুঝেছিলেন যে, কেবলমাত্র সামরিক শক্তির দ্বারা এই হিন্দু-অধ্যুষিত ভূমিতে কোনো সাম্রাজ্যকে স্থায়ী করা যায় না। সাম্রাজ্যের শাসিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর যোগ না থাকলে সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। হিন্দুদের সহযোগিতা, তাদের সঙ্গে সংযোগ এবং অভিজাততান্ত্রিক সাম্রাজ্যিক শাসনে তাদের অংশ ভাগ করে তোলার মধ্য দিয়েই একটি যৌথ স্থাপত্যে এই সাম্রাজ্যকে গড়ে তুলতে হবে। বস্তুত, আকবরই প্রথম মধ্যযুগে একটি ভারতীয় মাত্রা তাঁর নীতির মধ্যে নিয়ে এনেছিলেন। এই মাত্রারই অন্যতম দিক ছিল তাঁর রাজপুত নীতি। তিনি এক জাতীয় সাম্রাজ্য নীতির মধ্য দিয়ে ভারতীয় শৌর্য-বীর্যের প্রতীক রাজপুতদেরও অঙ্গীভূত করতে চেয়েছিলেন। ভারতবাসীরা মোগলদের বিদেশি আক্রমণকারী এবং মোগলদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আফগানদের ভারতীয় বলে মনে করত। আকবর রাজপুতদের আনুগত্য লাভ করে মোগল শাসনকে ভারতীয় চরিত্র দিতে চেষ্টা করেন। আকবর ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন পরিবর্তন আনেন। এযাবৎ প্রচলিত নীতি ছিল আঞ্চলিক শাসককে অধীন করে বড়ো রকমের ‘পেশকাশ’ আদায় করা এবং অভ্যন্তরীণ শাসনে তাদের স্বাধীনতা মেনে নেওয়া। কিন্তু আকবর এই শাসকদের উচ্চতম সামরিক কার্যে নিয়োগ করে সাম্রাজ্যকেই সেবা করার সুযোগ দিলেন এবং তাদের সাম্রাজ্যের মঞ্চের মাঝখানে নিয়ে এলেন। তুরানি, ইরানি অভিজাতদের প্রায় সমান মর্যাদা তাদের দেওয়া হল। আকবরের রাজপুত নীতিকেই এই প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হবে। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে রাজপুত রানারা দেশীয় শক্তিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল। আকবর তাদের মোগল শাসন স্তরবিন্যাসের মধ্যে নিয়ে আসেন। এর ফলে আফগানরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, হুমায়ুন যখন পলাতক অবস্থায় শাহ তমাস্পের দরবারে আশ্রয় নেন, তখন শাহ হুমায়ুনকে পরামর্শ দেন যে, ভারতে রাজপুত-আফগান মৈত্রী ভেঙে রাজপুত শক্তিকে মোগলের পক্ষে না আনলে ভারতে মোগলের ভবিষ্যৎ নেই। হুমায়ুন তার মৃত্যুর আগে এজন্য পুত্র আকবরকে রাজপুত মৈত্রী গঠনের পরামর্শ দেন। আকবর সেই পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন।

উদ্দেশ্য: 

আকবরের উদার রাজপুত নীতি গ্রহণের পশ্চাতে কয়েকটি উদ্দেশ্য ছিল। 
(1) আকবর উপলব্ধি করেন যে, শৌর্য-বীর্য ও সত্যনিষ্ঠায় রাজপুতরা অতুলনীয়। রাজপুতরা একটি শক্তিশালী জাতি, তাদের যুদ্ধে পরাজিত করা সম্ভব নয়। তারা ভারতবর্ষের বিশাল অঞ্চলের জমিদার। তাই ভারতবর্ষের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে গেলে তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা দরকার। 
(2) ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদেরই দেশ। এদেশে শক্তিশালী ও স্থায়ী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজপুত তথা হিন্দুদের আনুগত্য ও সমর্থন সর্বাগ্রে প্রয়োজন। তাই আকবর রাজপুতদের সম্পর্কে যুদ্ধনীতির পরিবর্তে মৈত্রীনীতি অবলম্বন করেন।
 (3) আকবর লক্ষ করেছিলেন সম্রাটের অনুচরবর্গের অধিকাংশই ছিলেন ভাগ্যান্বেষী, লোভী ও স্বার্থপর। ওমরাহ ও মোল্লারা ছিলেন ধর্মান্ধ ও হিন্দু বিদ্বেষী। এরা সুযোগ পেলে তুর্কি সুলতানির ন্যায় মোগল বা বাদশাহি শক্তির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে কুণ্ঠিত হতেন না। সমসাময়িক রাজনীতিতে ধর্মান্ধতার পরিবর্তে উদারতার প্রয়োজন ছিল সর্বাধিক। আকবর বিশ্বাস করতেন যে, রাজপুত ও হিন্দু মৈত্রী মুসলিম অভিজাতদের ক্ষমতা খর্ব করার জন্য একান্ত প্রয়োজন। আকবর রাজপুত এবং হিন্দুমৈত্রীর মধ্যে সঠিক নিরাপত্তার সন্ধান পেয়েছিলেন। 
(4) উত্তর-পশ্চিম ভারতের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অংশের বাণিজ্যপথগুলি সবই গেছে রাজপুতানার ওপর দিয়ে। সুতরাং আর্থিক কারণেও রাজপুত-মৈত্রী আকবরের কাছে অপরিহার্য ছিল।

পদ্ধতি :

1. বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন :

 আকবর নানাভাবে হিন্দু তথা রাজপুতদের সহানুভূতি অর্জনে তৎপর হন। প্রথমত, বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে মিত্রতা স্থাপন। 1562 খ্রিস্টাব্দে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে আকবর অম্বরের রাজা বিহারীমলের কন্যা যোধাবাইকে বিবাহ করেন। 1562 খ্রিস্টাব্দে আকবর আজমীর শরিফে খাজা মইনউদ্দিন চিশতির দরগায় যাওয়ার পথে অম্বরের (জয়পুর) রাজা বিহারীমল তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেন। অম্বররাজ মেওয়াটের শরিফউদ্দিনের আক্রমণে বিব্রত ছিলেন। তাই তিনি মোগল-বন্ধুত্ব কামনা করেছিলেন। রাজা বিহারীমল স্বেচ্ছায় আকবরের সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনের প্রস্তাব দেন। এ ছাড়া বিকানীরের রাজা কল্যাণমলের পুত্র রাই সিংও আকবরের বশ্যতা স্বীকার করেন। কল্যাণমলের ভ্রাতুষ্পুত্রীকে আকবর বিবাহ করেন। একইভাবে জয়সলমিরের রাজা হররাই তাঁর কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন আকবরের সঙ্গে। আবার আকবর রাজা ভগবান দাসের কন্যার সঙ্গে জাহাঙ্গিরের বিবাহ দিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ বেণীপ্রসাদের মতে, এই বিবাহ-সংক্রান্ত ঘটনা ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।

2. রাজপুতদের উচ্চপদে নিয়োগ : 

আকবর সামরিক ও অসামরিক বিভাগের উচ্চপদে রাজপুতদের নিয়োগ করেন। বিহারীমলের পুত্র ভগবান দাস ও পৌত্র মানসিংহ আকবরের অধীনে মনসবদার নিযুক্ত হন। মানসিংহ নিজ যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে অত্যন্ত উচ্চপদে নির্বাচিত হন এবং মোগল সাম্রাজ্যের এক স্তম্ভে পরিণত হন। এ ছাড়া টোডরমল, বীরবল প্রমুখ ছিলেন আকবরের অপর রাজপুত সভাসদ। টোডরমল ছিলেন একাধারে সুদক্ষ সেনাপতি ও রাজস্ববিশারদ। আকবরের সময়েই রাজপুত অভিজাতরা মোগল শাসনকাঠামোর অপরিহার্য উপাদান হয়ে ওঠেন। আকবর 7 হাজারি মনসবদারের পদও মানসিংহের মতো রাজপুত সেনাপতির জন্য খুলে দেন। মানসিংহের নেতৃত্বে আকবর বহু গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে জয়ী হন।

3. সহিমুতার নীতি গ্রহণ : 

সম্রাট আকবর রাজপুত জাতিকে মিত্রে পরিণত করার জন্য বিভিন্ন সহায়তামূলক নীতি গ্রহণ করেন। আকবর অনুগত রানাদের নিজ নিজ রাজ্যের স্বাধীনতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি রাজপুত রাজাদের বশ্যতার বিনিময়ে তাদের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেন। রাজপুত প্রধানদের তিনি এমন সব সুযোগসুবিধা দিয়েছিলেন যা কেবল এতদিন মুসলিম অভিজাতরাই একচেটিয়াভাবে ভোগ করছিল। আকবরের রাজপুত নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ উদার মানসিকতা এবং জিজিয়া কর বন্ধ করা, অ-মুসলমানদের তীর্থকর রহিত করা। আকবর নিজের স্ত্রীদের নিজেদের ধর্মমত পালনের অধিকার দিয়েছিলেন। 

মেবারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব :

 আকবর তাঁর রাজপুত নীতিকে কার্যকারী করার জন্য দুটি পন্থা নেন। ক) অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি কূটনীতি ও আলোচনার দ্বারা রাজপুত রাজাদের মিত্রতাগ্রহণে সম্মত করান। ও যেক্ষেত্রে তাঁর কূটনীতি ও শান্তিপূর্ণ প্রচেষ্টা বিফল হয়, সেক্ষেত্রে তিনি বলপ্রয়োগের নীতি নেন। মেবারের ক্ষেত্রে তাঁকে বলপ্রয়োগের পথা নিতে হয়। মেবারের রানা উদয় সিংহ আকবরের বশ্যতা স্বীকার করেননি। তাই 1567 খ্রিস্টাব্দে আকবর মেবারের রাজধানী চিতোর আক্রমণ করেন। তিনি 1568 খ্রিস্টাব্দে চিতোর দুর্গ অধিকার করলেও মেবারের অধিকাংশই উদয় সিংহের নিয়ন্ত্রণে ছিল। 1576 খ্রিস্টাব্দে হলদিঘাটের যুদ্ধে মেবারের রানা প্রতাপ সিংহ মোগল সৈন্যবাহিনীর কাছে পরাজিত হন। কিন্তু তিনি মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র অমরসিংহ মেবারের রানা হন। 1599 খ্রিস্টাব্দে মোগলবাহিনী মেবারজয়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।

আকবরের রাজপুত নীতির ফল : 

রাজপুতদের সঙ্গে এরূপ সৌহার্দ্যের ফলে রাজপুতানার মাড়োয়ার, বিকানীর, অম্বর, জয়সলমির, বুঁদি, কোটা প্রভৃতি রাজ্য আকবরের আনুগত্য স্বীকার করেছিল। পরবর্তীকালে মোগল পরিবারে অনেকেই কন্যা সম্প্রদান করে আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করেছিলেন। আকবরের সাম্রাজ্য বিস্তারে রাজপুত শক্তি যথার্থই কার্যকারী ভূমিকা পালন করেছিল। মেবারের রানা উদয় সিংহ এবং তাঁর পুত্র প্রতাপ সিংহের সঙ্গে মোগল সংগ্রামে রাজপুতবাহিনী ছিল পরম সহায়ক। ড. বেণীপ্রসাদের মতে, আকবর রাজপুত জাতিকে উপযুক্ত মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দিয়ে রাজপুত জাতির অমূল্য সহযোগিতা লাভ করেন। তাঁর মতে, আকবরের রাজপুত নীতির ফলেই মোগলদের চারপুরুষ ধরে মহান রাজপুত শক্তির সেবা ও সাহায্যলাভ সম্ভব হয়েছিল। রাজপুতদের আনুগত্য ও সেবার জন্য মোগল সাম্রাজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটানো সম্ভব হয়, সাম্রাজ্য সংহত হয়। আবার এই বন্ধুত্বের ফলে রাজপুতরাও লাভবান হয়েছিল। মোগলদের অধীনে উচ্চপদে কাজ করার জন্য তারা আর্থিক দিক থেকে লাভবান হয়েছিল। রাজপুতদের সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

 উপসংহার : 

রাজপুতদের প্রতি আকবরের উদার আচরণের ফলে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমগ্র হিন্দুজাতি আকবরের শাসনকে বিদেশি শাসন বলে মনে করেননি। তাঁরা মধ্যযুগের ভারত-ইতিহাসে আকবরকেই ‘জাতীয় নরপতি বলে মনে করতেন। আকবরের রাজপুত নীতি হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও ভারতের সাংস্কৃতিক জীবনে এক নবযুগের সূচনা করে। বহু রাজপুত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, চিত্রকর আকবরের রাজসভা অলংকৃত করতেন। এর ফলে সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়।

মধ্য ভারতের ইতিহাসের অন্যান্য বড় প্রশ্ন উত্তরঃ-

1. সুলতানীর পতন ও মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা

2. ইলতুৎমিসের কীর্তি

3. সুলতানি যুগের স্থাপত্য

4. ভক্তি আন্দোলন

5. শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা

6. শিবাজীকে কি মধ্যকালিন ভারতের সর্বশ্রেষ্ট

7. দাক্ষিণাত্য ক্ষত

8. আলাউদ্দিন খিলজি বাজারদর নিয়ন্ত্রণ

9. 

10. জায়গিরদারি সঙ্কট

Leave a Comment