রাজা রামমোহন রায় (Raja Ram Mohan Roy) -এর জীবন সংগ্রাম

রাজা রামমোহন রায়
রাজা রামমোহন রায়ের জীবন সংগ্রাম

-দেবাশীষ বিশ্বাস

রাজা রামমোহন রায়, যাকে ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক মানুষ বলা হয় । কারণ তিনি প্রথম পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন, তাছাড়া হিন্দুধর্মের কুসংস্কার দূর করে এক নতুন সংস্কৃতি রচনায় তিনি ব্রতী হয়েছিলেন।

১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে ২২ মে রামকান্ত রায়ের দ্বিতীয় স্ত্রী তারিণী দেবীর গর্ভে রামমোহন রায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তার পিতা রামকান্ত রায় পুত্রের শিক্ষার প্রতি উৎসাহ দেখে ভাবেন ছেলেকে মানুষের মত মানুষ করবে, তাই সংস্কৃত পড়াতে ছেলেকে কাশিতে পাঠান তিনি। রামমোহন রায় তার মেধার জোরে সংস্কৃতে পণ্ডিত হয়ে ফিরে আসেন। এরপর তিনি ফারসি শিখতে পাটনায় যান এবং সেবারেও তিনি পন্ডিত হয়ে ফিরে আসেন। অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই তার মেধার পরিচয় পাওয়া যায়।

রামমোহন রায় ১৫ বছর বয়সেই ছিলেন প্রচন্ড উগ্র ও নাস্তিক। তাই তার পিতা তাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্য পরিভ্রমণ করে নেপাল ,তিব্বত হয় চার বছর পর বাড়িতে ফেরেন। তখন রামমোহন রায় হিন্দুদের নানা আচার অনুষ্ঠানের কুসংস্কারের বিরোধিতা শুরু করেন, তা দেখে পিতা রামকান্ত রায় আবারো তাকে বাড়ি থেকে বার করে দেন। শেষে ১৮০৩ সালে পিতা রামকান্ত মৃত্যু হলে বাড়িতে তার মা তারিনি দেবি কোর্টে তার নামে কেস করেন। সেই মামলায় মা তারিনী দেবী পরাস্ত হয়েছিলেন।

রাজা রামমোহন রায়ের নাস্তিকতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখে ব্রাহ্মণ, খ্রিস্টান ,মুসলমান সবাই তার বিরোধিতা করেন।১৮১৫ সালে হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি প্রথম লিখলেন ‘বেদান্ত ভাষ্য’। এর পরপরই তিনি আরো ছয়টি বই লিখলেন-বেদান্তসার, কনোপনিষদ, ঈশোপনিষদ,কঠোপনিষদ, মান্ডুক্যপনিষ এবং মুণ্ডকোপনিষদ।১৮১৫ সালে তিনি তার বাড়ীতে তৈরি করলেন একটি সংগঠন নাম ‘আত্মীয় সভা’, যা পরবর্তীতে ১৮২৮ সালে ব্রাহ্মসমাজ নামে পরিচিত লাভ করে। এই সভায় আলোচনার বিষয় ছিল  একেশ্বরবাদ, হিন্দু ধর্মে আচার-অনুষ্ঠান নিয়ম। এসময় চারিদিক থেকে তাকে বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হলো। রাস্তাঘাটে তাকে নিয়ে তৈরি হলো নানান ব্যঙ্গ জনক গান ,ছড়া ইত্যাদি। এমনকি রটিয়ে দেওয়া হলো তিনি বিধর্মী গরুর মাংস খান।

রাজা রামমোহন রায় ছিলেন একেশ্বরবাদ।ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে তিনি বলেন হিন্দু হোক কিংবা মুসলমান বা খ্রিস্টান এক ঈশ্বর কে যারা নানান ভাবে দেখেন তারা ভন্ড ছাড়া কিছুই নয়। তারে কথা শুনে মুসলমান ও খ্রিস্টানরাও তার বিরোধিতা করতে শুরু করলেন। রাজা রামমোহন রায় খ্রিষ্টানদের ধর্ম নিয়ে একটি বই লিখেন যার কারণে তিনি প্রচণ্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হল।কিন্তু তার যুক্তি দেখে খ্রিস্টানরা চুপ করে রইলেন।

রামমোহন রায় হিন্দুদের মধ্যে সতীদাহ প্রথা বা সহমরণ প্রথা দেখে মনে মনে খুবই ব্যথিত হলেন। নারীদের প্রতি এই কঠোর নিয়ম যার কোনো যুক্তি নেই তা তিনি সইতে পারলেন না। তাই তিনি লিখলেন প্রবর্তক ও নিবর্তকের সন্বাদ । এই বইয়ে তিনি প্রমাণ করলেন সতীদাহ প্রথা একটি কু-সংস্কার যার কোন যুক্তি নেই।১৮২৮ সালে লর্ড বেন্টিং ভারতের গভর্নর হয়ে আসেন, তিনি ছিলেন উদার ও আধুনিক মানসিকতার মানুষ, রামমোহন রায় তার কাছে সতীদাহ প্রথা বন্ধের আবেদন জানালেন। ১৮২৯ সালে ৪ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে সতীদাহ প্রথা কে বাতিল বলে ঘোষণা করলেন।কিন্তু এর বিরোধিতায় ব্রাহ্মণরা ধর্মসভা নামে একটি সংগঠন তৈরি করেন, সেই সংগঠনের নেতৃত্ব দেন রাধাকান্ত দেব, মহারাজা গোপিকৃষ্ণ, হরনাথ তর্কভূষণ, রাম কমল সেন, জয় কৃষ্ণ সিংহ, মতিলাল শীল ইত্যাদি। তাদের পত্রিকা সমাচার চন্দ্রিকায়  রামমোহনের বিরোধিতা করতে লাগলেন। রাজা রামমোহন রায়ের পাশেও তখন বহু মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন।হিন্দুরা যে দরখাস্ত পেশ করেছিলেন তা মোকাবেলা করার জন্য রামমোহন রায় বিলেতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দিল্লির বাদশাহ ও মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর তার নিজের প্রয়োজনে তাকে রাজা উপাধি দেন এবং ইংল্যান্ডের নিজের দ্রূত হিসেবে প্রেরণ করেন। ১৮৩০ সালের নভেম্বরে তিনি  বিলেতে রওনা দেন। অবশেষে লন্ডনে পৌঁছে পি ভি কাউন্সিল এর কাছে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করার জন্য নানান যুক্তি পেশ করেন।যার ফলে রাজা রামমোহন রায় বিজয়ী হলেন এবং সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষনা হলো।

রামমোহন রায় ছিলেন সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর। তিনি ছিলেন প্রকৃত গদ্য সাহিত্যের জনক। আধুনিক ভারতবর্ষে তাকেই প্রথম আধুনিক মানুষ বলে চিহ্নিত করা হয়।

[বিদ্রোঃ- আর্টিকেল ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ সালে Historicise Link -এ প্রকাশিত হয়েছে। Historicise Link কে more proffessional and more user friendlly বানাতে পরবর্তীতে Nana Ronger Itihase-এ Migrate হয়েছে। এই পক্রিয়া চলাকালীন আমরা(Admin) কিছু সমস্যার সম্মুখীন হই, যেকারণে আর্টিকেল প্রকাশের সঠিক সময় আসেনি। এর জন্য আমরা(Admin) ক্ষমা প্রার্থী। পাশাপাশি আমরা আনন্দিত কারণ, Nana Ronger ItihaseIndia’s first and largest academic social network in history. ]

কলমে- দেবাশীষ বিশ্বাস
ঠিকানা-কামাখ্যাগুড়ি তেতুলতলা চৌপতি, উত্তর পারোকাটা, আলিপুরদুয়ার।

আপনাদের মূল্যবান লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের। যেকোনোও সময়, যেকোনও দিন। আমরা প্রকাশ করবো।

বিষয়:-

বিজ্ঞানের আবিষ্কার,চলচ্চিত্র, খেলাধুলা, সভা-সমিতি, মনীষীদের জীবন, ধর্মান্ধতা, সামাজিক সংকট, কুসংস্কার বিরোধী, পলিটিক্যাল স্ক্যাম, পলিটিক্যাল ইস্যু, পলিটিক্যাল টেরোরিজম, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে এমন যেকোন বিষয়েই লেখা পাঠানো যাবে।

নির্দিষ্ট কোন শব্দ সীমা নেই।

WhatsApp করে লেখা পাঠান:- 8116447650

…. প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন আমাদের WhatsApp নম্বরে …

লেখকের অন্যান্য লেখা:-
1. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও তৎকালীন নারী সমাজ: Click Here

Leave a Comment