[New] শেরশাহ শাসক হিসেবে আকবরের অগ্রদূত ছিলেন ? | Nana Ronger Itihas

Review various administrative and economic reforms of Sher Shah with special reference to his influence on Akbar?
[আকবরের উপর তার প্রভাবের বিশেষ উল্লেখ সহ শের শাহের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার পর্যালোচনা করুন?]
Do you agree with the view that Sher Shah was the precursor to Akbar as a ruler ?
[আপনি কি এই মতের সাথে একমত যে শেরশাহ শাসক হিসেবে আকবরের অগ্রদূত ছিলেন?]

Ans.

শেরশাহ ছিলেন মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসের অন্যতম একজন সুদক্ষ প্রশাসক। ঐতিহাসিক কীন মন্তব্য করেছেন সাম্রাজ্য সংগঠনে শেরশাহ ব্রিটিশদের থেকেও পারদর্শী ছিলেন। তিনি মাত্র পাঁচ বছর রাজত্ব করেছিলেন। কিন্তু এই স্বল্পকালের মধ্যে তিনি সামরিক ও শাসনতান্ত্রিক প্রতিভার সমন্বয়ে সাম্রাজ্যের শান্তি রক্ষা ও উৎকৃষ্ট শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবের স্থান অধিকার করেছেন। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ রাজত্বকালে শেরশাহের কিছু কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। তারই দৃঢ় ভিত্তির উপর সম্রাট আকবর মুঘল সাম্রাজ্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাই কোনো কোনো ঐতিহাসিক শেরশাহকে আকবরের পথপ্রদর্শক বলে বর্ণনা করেছেন। তবে এ বিষয় ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। শেরশাহের সামরিক প্রতিভা, শাসন সংস্কার, ধর্মনীতি প্রভৃতি আলোচনা করে এ বিষয়ে আমাদের স্থির সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
শেরশাহের শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বোচ্চ ছিলেন সম্রাট স্বয়ং। শাসনব্যবস্থার সুষ্ঠু  পরিচালনার জন্য তিনি চারজন মন্ত্রী নিয়োগ করেছিলেন। এরা হলেন—(ক) দেওয়ান-ই-আরিজ বা সামরিক মন্ত্রী (খ) দেওয়ান-ই-উজিরাৎ বা রাজস্ব মন্ত্রী (গ)দেওয়ান-ই-রাসালাত বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। (খ) দেওয়ান-ই-ইনসা বা রাজকীয় ইস্তাহার বিষয়ক মন্ত্রী। এছাড়াও আরো দুই ধরনের মন্ত্রীর কথা জানা যায়, যেমন দেওয়ান-ই-কাজা বা প্রধান কাজী ও দেওয়ান-ই-বারীদ বা গুপ্তচর প্রধান।
প্রশাসনিক সুবিধার্থে শেরশাহ তার সাম্রাজ্যকে 47টি ‘সরকার’-এ বিভক্ত করেছিলেন। “সরকার গুলিকে তিনি আবার কয়েকটি পরগণায় বিভক্ত করেছিলেন। শাসনব্যবস্থার একেবারে নিম্ন একক ছিল গ্রাম। ‘সরকার’গুলি প্রধান শিকদার, প্রধান মুনশিক ও প্রধান কাজীর দ্বারা পরিচালিত হত। ‘পরগণা’গুলি পরিচালিত হত একজন শিকদার, একজন আমিন, একজন ফোতদার ও দুজন কারকুনের মাধ্যমে। নিচতলার গ্রামীণ শাসন ক্ষমতা চৌধুরী, মুকাদ্দাম, খুৎ, মুখিয়াদের উপর নির্ভরশীল ছিল।
শেরশাহের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল রাজস্ব ও মুদ্রা ব্যবস্থার সংস্কার। শেরশাহ প্রথম জীবনে জায়গিরদার ছিলেন। তাই তিনি কৃষকদের মূল অসুবিধাগুলি অনুভব করতেন। এই অসুবিধাগুলি দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষি ও ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় তিনি আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন— যাকে আধুনিক ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার ভিত্তি বলা চলে। শেরশাহ জমি জরিপ ও মাপজোখ করে রায়তদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। শেরশাহের রাজস্বের হার ছিল, উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ অথবা এক-চতুর্থাংশ। সাধারণত, জমির উর্বরতা অনুযায়ী রাজস্ব স্থির করা হত। জমিতে চাষির অধিকার স্বীকার করে সরকার চাষিকে দিতেন লিখিত ‘পাট্টা’ ও সম্রাটের কী প্রাপ্য তা স্বীকার করে চাষীকে লিখিত ‘কবুলিয়ত’ নিতে হত। ‘কবুলিয়ত’ ও ‘পাট্টা” ব্যবস্থা প্রবর্তন করে তিনি ভূমিরাজস্ব সংস্কারের ক্ষেত্রে অনন্য শাসনতান্ত্রিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবরও এই পথ অনুসরণ করেছিলেন। শেরশাহ রাজস্ব আদায়ে কঠোরতা অবলম্বন করতেন না। দুর্ভিক্ষের সময় খাজনা মকুব করা হত। কৃষির উন্নতির স্বার্থে তিনি ‘কৃষি ঋণেরও প্রচলন করেছিলেন। ভূমিরাজস্ব ছাড়াও শেরশাহ বাণিজ্য শুল্ক, জিজিয়া, জাকাৎ, খামস প্রভৃতি সুলতানি যুগের কর কাঠামোকে বজায় রেখেছিলেন।
রাস্তাঘাট নির্মাণ ছিল শেরশাহের আরেকটি অন্যতম কৃতিত্ব। ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য তিনি কয়েকটি সুদীর্ঘ রাজপথ নির্মাণ করেছিলেন এবং বহু রাস্তার সংস্কার করেছিলেন। সোনার গাঁ থেকে সিন্ধু পর্যন্ত দীর্ঘ গ্রাণ্ড ট্যাঙ্ক রোড তিনি তৈরি করেছিলেন। এছাড়া আগ্রা থেকে চিতোর, লাহোর থেকে মুলতান প্রভৃতি কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রাস্তা তিনি তৈরি করেছিলেন। প্রতিটি রাস্তার দুপাশে বৃক্ষরোপণ ও সরাইখানা নির্মাণ করেছিলেন। রাস্তাগুলিতে যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সুরক্ষিত করেছিলেন। ঐতিহাসিক নিজামউদ্দিন বলেছেন, “রাস্তাঘাটে কেউ যদি সোনার থলি নিয়েও রাত্রে ঘুমিয়ে পড়ত, তা চুরি যাওয়ার কোনো ভয় ছিল না।”
শেরশাহ তাঁর সামরিক ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলেছিলেন। অস্ত্রবলে তিনি ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তাই শক্তিশালী সামরিক ব্যবস্থাই যে তাঁর অস্তিত্বের সমর্থক তা তিনি অনুভব করেছিলেন। তাই তিনি সামরিক বিভাগকে ঢেলে সাজান। এ ব্যাপারে তিনি তাঁর পূর্বসুরী আলাউদ্দিন খলজীর সামরিক ব্যবস্থার অনুসরণ করেছিলেন। আফগানরাই ছিল তার সামরিক বাহিনীর মূল উপাদান। তবে সেনাবাহিনীতে হিন্দু-মুসলিম কোনো বিভেদ ছিল না। যোগ্যতাই ছিল পদলাভের একমাত্র মাপকাঠি। যোগ্যতার বলেই ব্রহ্মজিৎ গৌড় নামক এক হিন্দু শেরশাহের প্রধান সেনাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। শেরশাহের নিজস্ব দেড় লক্ষ অশ্বারোহী, পঁচিশ হাজার পদাতিক ও পাঁচ হাজার গোলন্দাজ ছিল। সৈনিকদের অর্থের মাধ্যমে বেতন দেওয়া হত। “দাগ ও হুলিয়া” প্রথা চালু ছিল।
ধর্মের ব্যাপারে শেরশাহ ছিলেন উদার। নিষ্ঠাবান মুসলমান হয়েও তিনি ছিলেন পরধর্মসহিষ্ণু। নিজ ব্যক্তিগত ধর্মমতকে তিনি কখনই প্রজাদের উপর চাপিয়ে দেননি। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে উচ্চপদ লাভের ক্ষেত্রে ধর্ম কখনই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। আগেই বলা হয়েছে, ব্রহ্মজিৎ গৌড় নামক হিন্দু ব্রাহ্মণ ছিলেন তার প্রধান সেনাপতি। যোগ্যতাই ছিল তার কর্মচারী নিয়োগের মাপকাঠি। ডঃ কানুনগো বলেছেন— “His attitudes towards Hindus was not of continued sufferance but of respectful deference.” তবে তাঁর সময় জিজিয়া কর আদায় করা হত। বিচারের ক্ষেত্রেও তিনি নিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করতেন। ন্যায়বিচার প্রবর্তনে তাঁর প্রচেষ্টা ছিল আন্তরিক। বিচারের সময় নিকট আত্মীয়দেরও যথাযোগ্য শাস্তি দেওয়া হত।

পর্যালোচনা :

শেরশাহের শাসনব্যবস্থা পর্যালোচনা করে বলা যায়, তিনি ছিলেন মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসের একজন দক্ষ, পরিশ্রমী ও শক্তিশালী প্রশাসক। তিনি এমন রাজস্ব ব্যবস্থা প্রচলন করেছিলেন, যেগুলি তাঁর মৌলিক চিন্তার স্বাক্ষর বহন করে। প্রশাসনকে তিনি একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ধর্মীয় গোঁড়ামি যুক্ত প্রজাকল্যাণকামী রাষ্ট্র চেতনা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সাসারামের এক ক্ষুদ্র জায়গিরদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি সামরিক প্রতিভার বলে মুঘলদের পরাজিত করে মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন। তিনি শুধু একজন সামরিক যোদ্ধাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সুচতুর রাজনৈতিক সংগঠক। ছত্রভঙ্গ আফগান জাতিকে সমবেত করে তিনি রাষ্ট্রীয় ঐক্যের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। শিক্ষা-দীক্ষায়ও তিনি পারদর্শী ছিলেন। আরবি, ফারসি ও ইতিহাসের প্রতি তার যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। মালিক মহম্মদ জায়সীর পদ্মাবৎ কাব্য রচনা ও বৈষ্ণবধর্মের নবজাগরণ তাঁর সময়েই ঘটেছিল। অতি স্বল্পকালীন রাজনৈতিক জীবনে স্থাপত্য রীতিতে তিনি হিন্দু-মুসলিম-আফগান-পারসিক রীতির সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তাঁর স্থাপত্য-শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বিহারের সাসারামে তৈরি নিজস্ব সমাধি। দিল্লির ‘পুরাণ কিন্না’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্প নিদর্শন।
উপরিউক্ত এই গুণাবলীর জন্য ঐতিহাসিক উলসীহেগ শেরশাহকে মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট বলে অভিহিত করেছেন। আধুনিক ঐতিহাসিকরা এজন্য শেরশাহের সঙ্গে মুঘল রাজবংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট আকবরের তুলনা করার চেষ্টা করেছেন। তবে শেরশাহের সঙ্গে আকবরের তুলনা করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে আকবর ছিলেন মধ্যযুগের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আকবরের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল অনেকটাই বিজ্ঞানসম্মত। মনসবদারি ব্যবস্থার প্রবর্তন আকবরের সামরিক শক্তিকে যথেষ্ট শক্তিশালী করেছিল। ধর্মের ক্ষেত্রেও আকবর ছিলেন শেরশাহের থেকে অনেক উদার। শেরশাহ ‘জিজিয়া করা প্রত্যাহার কারেননি এবং রাইসিন দুর্গ দখলের সময় ও রাজপুতদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণের সময় ‘জেহাদ’ কথাটি ঘোষণা করা—তাঁর ধর্মান্ধতার পরিচয় বহন করে। কিন্তু আকবর তাঁর রাষ্ট্রকে জাতীয় রাষ্ট্রে উন্নীত করতে আন্তরিক ছিলেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের আদর্শ ও সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের নীতিকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অপরদিকে শেরশাহের জাতীয়তার ধারণাই ছিল না। তিনি কখনই ভারতীয় জাতির কথা ভাবেননি। আকবর হিন্দুদের উপর থেকে ‘জিজিয়া’ কর (1564) ও তীর্থকর (1563) তুলে দিয়ে ভারতের জাতীয় ঐক্য সম্পূর্ণ করেছিলেন। তাঁর ‘সুলহ-ই-কূলের’আদর্শ সমসাময়িক মুসলিম শাসকদের থেকে তাঁকে আলাদা করেছে। মধ্যযুগের মুসলিম শাসকদের মধ্যে একমাত্র আকবরই “Nation builder”—আখ্যায় ভূষিত হয়েছিলেন। তাই সব দিক বিচার করে শেরশাহকে আকবরের পথ প্রদর্শক বলা যায় না। ডঃ কানুনগো বলেছেন, “Akbar is justly entitled to higher place in History than Sher Shah.’

Leave a Comment