ইতিহাস রচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান | Archaeological Sources

প্রশ্নঃ-    প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের অবদান আলোচনা করো। 

অথবা,    ভারতের ইতিহাস রচনায় প্রাচীন লিপি ও মুদ্রার গুরুত্ব আলোচনা করো।

 
উত্তর:- প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্বের এক বিরাট ভূমিকা আছে। প্রত্নতত্ত্বের মাধ্যমে যে ইতিহাস রচিত হয় তা বিজ্ঞানভিত্তিক। সাম্প্রতিককালে রেডিও কার্বন পরীক্ষা পদ্ধতি একে আরও বিজ্ঞানসম্মত রূপ দান করে যে বিজ্ঞান আমাদের সুশৃংখলভাবে খনন কার্য করতে এবং জনসাধারণের বাস্তব জীবনের সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে সাহায্য করে তাকে বলা হয় প্রত্নবিদ্যা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাজ হল প্রত্নবস্তু থেকে  তথ্য সংগ্রহ করা এবং সংগৃহীত তথ্য কে বিশ্লেষণ করে তা থেকে অতীতের ধারণা গড়ে তোলা। ঐতিহাসিকরা এইসব মতামতের সাহায্য গ্রহণ করে ইতিহাসের সূত্র গড়ে তোলেন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলিকে মোটামুটি তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়, যথা
  • লিপি 
  • মুদ্রা
  • স্মৃতিসৌধ, স্থাপত্যভাস্কর্য। 

ইতিহাস রচনায় প্রাচীন লিপির গুরুত্বঃ-

লিপি প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় একটি উৎকৃষ্ট উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়  থাকে। বস্তুত প্রাচীন ভারতের লুপ্ত ইতিহাস যতটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তার বেশীর ভাগের জন্য আমরা লিপি বা লেখমালার কাছে ঋণী। প্রাচীনকালের সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যথা দ্বিগবজয়, ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, শাসন পরিচালনার প্রভৃতি, প্রধানত লিপিগুলিতে উৎকীর্ণ হয়ে রয়েছে। তাছাড়া লিপিগুলিতে সন, তারিখ, রাজার রাজ বংশের নাম পাওয়া যায়। সাধারণভাবে পাথর, লোহা, তামা, রুপা, সোনার উপর এবং মন্দিরগাত্রে ইট এমনকি বিভিন্ন মূর্তির গায়েও লিপি খোদাই করা হত। মাটির উপরিভাগে বিশেষ করে পর্বত  গাত্রেই যে লিপি পাওয়া যায় তাই নয়, মাটির তলা থেকেও বহু লিপি পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত প্রায় সমস্ত লিপি বিভিন্ন জাদুঘরে (Museum) সংরক্ষিত আছে।

ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত লিপির মধ্যে হরপ্পা লিপি প্রাচীনতম। তবে হরপ্পা সভ্যতার লিপি সম্বন্ধে আমরা এখনো অজ্ঞান, কারণ এর পাঠোদ্ধার আজও সম্ভব হয়নি। প্রাচীন লিপির মধ্যে সর্বপ্রথম মৌর্য আমলের লিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে জেমস প্রিন্সের নামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জনৈক কর্মচারী অশোকের উৎকীর্ণ লিপির পাঠোদ্ধার করেন। ভারতীয় লিপিগুলি, প্রাকৃত, সংস্কৃত মিশ্রিত উপভাষা অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত। অল্পকিছু লিপি পাওয়া যায় যেগুলো বিদেশিওয়, বিশেষ করে গ্রিক বা আরামীয় ভাষায় রচিত। প্রাচীন ভাষায় রচিত লিপি গুলি প্রধানত ব্রাহ্মী খরোষ্ঠী লিপিতে লেখা।মৌর্য যুগ থেকে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে যে লিপি ব্যবহৃত হয়েছিল তাতে মূলত ব্রাহ্মী লিপি ব্যবহৃত হত। অষ্টম শতকের পরবর্তীকালে অবশ্য স্থানীয় বিভিন্ন ভাষায় লিপি উত্তীর্ণ হতে থাকে। দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃত ছাড়া এই সময় তামিল, তেলেগু, মালয়ালাম, কানারি ভাষায় লিপি উৎকীর্ণ হত।উদ্দেশ্য বিচারের লিপি গুলি কে কয়টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, যেমন

i) রাষ্ট্রীয় লিপি:- এর মধ্যে সাধারণত রাজার আদেশ, নির্দেশমূলক অনুশাসন, সাম্রাজ্যের সীমা চিহ্নিত লিপি, দলিলপত্র ইত্যাদি লেখা হত।

ii) দানপত্র:- এগুলি সাধারণত তামা বা অন্য কোন ধাতুর ফলকে লেখা হতো এবং এর মধ্যে দাতা গৃহীতার নাম, উদ্দেশ্য লেখা থাকতো।

iii) রাজপ্রশস্তি:- এরমধ্যে রাজা সভাসদ কর্তৃক রাজার নাম, কর্মে প্রশংসা ইত্যাদি ব্যক্ত করা হত। প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক লক্ষ্য করেছেন, প্রশস্তি লিপি গুলি অধিকাংশই পক্ষপাতিত্বের দোষে দুষ্ট। প্রশস্তি গুলির মধ্যে হরিসেন বিবর্জিত সমুদ্রগুপ্তের  এলাহাবাদ প্রশস্তি গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীরনাসিক প্রশস্তি‘, সকক্ষত্রপ রুদ্রদামনেরজুনাগড় প্রশস্তিইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

কয়েকটি বিদেশি লেখা থেকেও ভারতের ইতিহাসের উপাদান পাওয়া গেছে, যেমনএশিয়া মাইনরে প্রাপ্তবোঘাজ কই(Boghaz Koi) লিপি, বেহিস্তান লিপি, ইরানে প্রাপ্ত পারস্য সম্রাট দরায়ুসেরপারসেপলিস নক্সী রুস্তম (Nakshi Rustom) লিপি ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দ্বীপ দ্বীপপুঞ্জ, সিংহল ইত্যাদি স্থানে প্রাপ্ত লিপি গুলি থেকে ভারতীয় ধর্ম, সভ্যতা সংস্কৃতির বিস্তার এর কাহিনীও পাওয়া যায়।

লিপির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হল এই যে সেই সুদূর অতীত কালের যে ঘটনা লিখে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তা আজও অবিকল অবস্থায় রয়েছে। ভয়াবহ প্রকৃতির বিপর্যয়েও এগুলি নষ্ট হয়নি। লিপির গুরুত্ব এত বেশি যে অন্য কোন উৎসব, বিশেষ করে সাহিত্য মুদ্রা থেকে প্রাপ্ত তথ্য লিপি কর্তৃক অনুমোদিত হয়। তাই ডক্টর ভিনসেন্ট স্মিথ (V. Smith) বলেছেন“Inscription have been given the first place in the list, because they are on the whale, the must important and trustworthy sources of our knowledge.”

ইতিহাস রচনায় প্রাচীন মুদ্রার গুরুত্ব:-

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো প্রাচীন মুদ্রা। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে প্রাচীন মুদ্রা পরীক্ষানিরীক্ষা করে ঐতিহাসিক তথ্য নিরূপণ কে মুদ্রাসংক্রান্ত বিদ্যা বা Numismaties বলা হয়। মুদ্রা সংক্রান্ত বিদ্যাকে পারদর্শী ব্যক্তিরা প্রাচীন মুদ্রা পর্যবেক্ষণ করে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য আবিষ্কার করতে পারেন। মুদ্রায় খোদিত ছবি, নাম, সনতারিখ এবং মুদ্রায় ব্যবহৃত ধাতু সমসাময়িক  অর্থনৈতিক, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অবস্থার মূল্যায়নে এবং ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম নিরূপণ করতে বিশেষ সাহায্য করে। স্থান, কাল, ব্যক্তি চিন্তাধারা ঐতিহাসিক এই চারটি অপরিহার্য বিষয় সম্পর্কে মুদ্রা সঠিক তথ্য সরবরাহ করে।

ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে লিপির মত মুদ্রারও কতগুলি বৈশিষ্ট্য আছে, যেমন

i) মুদ্রাগুলি ধাতু নির্মিত। ধাতুর গুণগত উৎকর্ষ অপকর্ষ সমকালীন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনুমান পরিচয় বহন করে।

ii) মুদ্রার উপর রাজার নাম,সন,তারিখ, আরদ্ধ দেবতার প্রতিকৃতি,রাজার প্রতিকৃতি ইত্যাদি খোদাই থাকে। এই বৈশিষ্ট্য থেকে কোন রাজা, কোন সময়ে, কোথায় রাজত্ব করতেন এবং তার ধর্ম সংস্কৃতি কি ছিল ইত্যাদি পরিচয় মুদ্রা থেকে পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ ইন্দোগ্রিক, শক, পল্লব, কুষাণ নরপতিগণ তাদের রাজত্বের প্রধান নির্ভরশীল উপাদান হল মুদ্রা। এছাড়া ইতিহাসের কাল নির্ণয়ে মুদ্রা অদ্বিতীয় ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন মুদ্রা থেকে পাওয়া গেছে বিক্রমাদিত্য, শকাব্দ, গুপ্তাব্দ, হর্ষাব্দ ইত্যাদি।

iii) ধাতুর ওপর খোদিত মূর্তি লিপি নিয়েই মুদ্রা। তাই মুদ্রা সমকালীন ধাতু শিল্পজ্ঞান, সৌন্দর্যবোধ অর্থনৈতিক অবস্থা
ব্যক্ত করে।

iv) প্রাপ্তিস্থান বিচারে মুদ্রা সংশ্লিষ্ট নরপতি রাজ্য বা সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা প্রদান করে। আবার ভারতীয় মুদ্রা বহি ভারতে এবং বহিঃ ভারতীও মুদ্রা ভারতে পাওয়া গেছে। এর দ্বারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক যোগাযোগের ধারণা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে ভারতের সঙ্গে রোমের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল।

ইতিহাস রচনায় স্মৃতিসৌধ, স্থাপত্য-ভাস্কর্য  গুরুত্বঃ-

প্রাচীন ভারতের  পরিপূর্ণ ইতিহাস রচনার জন্য ধ্বংসস্তূপ গুলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সৌধ, স্মৃতিস্তম্ভ, মন্দির বা প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ থেকেও প্রাচীনকালের সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে এইসব ধ্বংসস্তূপে সরাসরি কোনো মূল্য না থাকলেও অপরাপর বিষয়ে, বিশেষত সাংস্কৃতিক ধর্মীয় ইতিহাস রচনায় এইগুলির অবদান অস্বীকার করা যায় না। উদাহরণস্বরূপহরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, আর্যদের আগমনের পূর্বেই ভারতে এক সমৃদ্ধ সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসাবশেষ থেকে এই যুগের উন্নত সংস্কৃতি ধর্মবিশ্বাসের তথ্য সমাজ জীবনের সুদীর্ঘ বিবরণ রচনা করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া পাটুলিপুত্র, সারনাথ, তক্ষশীলা প্রভৃতি নগরীর ধ্বংসাবশেষ থেকে সমসাময়িক জনসাধারণের ধর্ম ভাবনা, জীবনযাত্রা, শিল্পকর্ম সম্বন্ধে জানা সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন মঠ, মন্দিরের নির্মাণশৈলী বা মন্দিরগাত্রে খোদিত চিত্রাবলী থেকেও প্রাচীনকালের ধর্ম ভাবনা বা স্থাপত্যভাস্কর্য কর্মের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে মন্দির বা মঠের গঠনশৈলী থেকে ভারতীয় শিল্পের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা করা যায়।

PDF DOWNLOAD NOW

Reference:- 

1. Image credit lookandlearn.com/ [https://www.lookandlearn.com/history-images/YW037592V/Lucknow-India-the-Lucknow-Residency-in-ruins-gateway-and-banqueting-room-showing-damage-caused-during-the-Indian]

2. Image credit – wikipedia.org [https://en.wikipedia.org/wiki/Linear_B]Image credit- en.

3. Image credit- wikipedia.org [https://en.wikipedia.org/wiki/File:Ilt4.jpg]

4. Image credit- commons.wikimedia.org [https://commons.wikimedia.org/wiki/File:Konark_Sun_Temple_Details_11100.jpg]

Leave a Comment