[New] ডিরোজিও ও নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন | Derozio and Young Bengal movement

উনিশ শতকে বাংলার ইতিহাসে ইয়ংবেঙ্গল আন্দোলনের ভূমিকা লেখো।

[Write the role of Young Bengal movement in the history of Bengal in 19th century.]

অথবা,

‘নব্যবঙ্গ’ বলতে কাদের বোঝানো হয়? উনিশ শতকে বাংলার সামাজিক জাগরণে তাঁদের অবদান ব্যাখ্যা করো।

[Who is meant by ‘Navyabanga’? Explain their contribution to the social awakening of Bengal in the 19th century.]

অথবা,

ডিরোজিও ও নব্যবঙ্গ আন্দোলনের বিবরণ দাও।

[describe Derozio and the New Bengal movement.]

অথবা,

‘নব্যবঙ্গ’ কাদের বলা হয়? ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার ইতিহাসে তারা কী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল ?

[who is called ‘Navyabanga’? What role did they take in the history of Bengal in the nineteenth century?]

উত্তর:-

নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের ভূমিকা: 

ফরাসি বিপ্লবের মানবিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং রুশো, ভলতেয়ার, হিউম, লক, বেকন, টমপেইন, বেনথাম, রিড প্রমুখ পাশ্চাত্য দার্শনিকের যুক্তিবাদী দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এক যুব সম্প্রদায় হিন্দু কলেজের অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও-র নেতৃত্বে হিন্দুসমাজে প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে তীব্র জেহাদ ঘোষণা করেন, যা নব্যবঙ্গ বা ইয়ংবেঙ্গল আন্দোলন নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক তারাচাঁদের মতে—রক্ষণশীল হিন্দুসমাজে তাঁরা যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন তার ফলে। চিন্তাজগতেও বিপ্লব ঘটেছিল।

নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের মতাদর্শ : 

দীর্ঘদিন ধরে হিন্দুসমাজে ধর্মকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত কুসংস্কার প্রচলিত ছিল সেগুলির বিরুদ্ধে নব্যবঙ্গীয়রা সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন আর্থসামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যে সমস্ত ভণ্ডামি বা লোক দেখানো নিয়মকানুন ছিল সেগুলির অবসান ঘটাতে। তাঁরা জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা, সতীদাহ প্রথাসহ বেশ কিছু কুপ্রথাকে সমূলে বিনাশ করার আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ছাত্রদের প্রতি ডিরোজিওর শিক্ষার মূল বক্তব্য ছিল—স্বাধীন চিন্তার দ্বারা মত ও পথ স্থির করবেকোনো প্রচলিত সংস্কার অন্ধভাবে অনুশীলন করবে নাজীবনে ও মরণে একমাত্র সত্যকেই অবলম্বন করবেসৎ গুণ অনুশীলন করবেআর যা কিছু অন্যায় ও অসং তা পরিহার করবে।

নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন গোষ্ঠীর সদস্যগণ : 

ইয়ংবেঙ্গল বা নব্যবঙ্গীয় গোষ্ঠীর সদস্যগণ হলেন রামতনু লাহিড়ী, রসিককৃয় মল্লিক, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, প্যারীচাঁদ মিত্র, লালবিহারী দে, মাধবচন্দ্র মল্লিক, তারাচাঁদ চক্রবর্তী, শিবচন্দ্র দেব, কিশোরী চাঁদ মিত্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রাধানাথ শিকদার, কাশীপ্রসাদ ঘোষ, মহেশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ। অধ্যাপক সুশোভন সরকারের মতে- ডিরোজিয়ানরা তাঁদের শিক্ষকের স্মৃতির প্রতি শেষ পর্যন্ত অনুগত ছিলেন এবং নিজেরা পারস্পরিক সহানুভূতি ও বন্ধুত্বের বাঁধনে আবদ্ধ ছিলেন

কার্যাবলি: 

ইয়ংবেঙ্গল বা নব্যবঙ্গীয়রা সে সময়কার সমাজের জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা, সতীদাহ প্রথাসহ বিভিন্ন কুসংস্কার ও নানা আর্থসামাজিক কুপ্রথাগুলির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। ডিরোজিয়ানরা হিন্দুসমাজের নিয়ন্ত্রক ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ করে বলতেন—আমরা গরু খাই গো। কালীঘাটের মা- কালীকে সম্বোধন করতেন গুড মর্নিং ম্যাডাম” বলে। ডিরোজিয়ানরা ফ্রান্সের ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে জুলাই বিপ্লবের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে কলকাতার টাউন হলে এক বিজয় উৎসব পালন করে ও ফরাসি বিপ্লবের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা মনুমেন্টে (এখনকার শহিদমিনার) টাঙিয়ে দেয় (২৫ ডিসেম্বর)। নবাবগীয়রা সনাতন হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতার তীব্র সমালোচনা করেন। রসিককৃষ্ণ মল্লিক বলেন— আমি গঙ্গানদীর পবিত্রতা বিশ্বাস করি না। আসলে নব্যবঙ্গীয়রা সমকালীন হিন্দু সমাজব্যবস্থা ও হিন্দুধর্মের গোঁড়ামিগুলিকে সহ্য করতে পারত না। ডিরোজিওর ছাত্র মাধবচন্দ্রের এক উক্তি থেকে এটি আরও স্পষ্টরূপে বোঝা যায়। মাধবচন্দ্র বলেন- যদি আমরা আমাদের হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে কোনো কিছুরে ঘৃণা করে থাকি তবে তা হল হিন্দুত্ব।

অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন গঠন : 

ডিরোজিও তাঁর অনুগামীদের নিয়ে মানিকতলায় শ্রীকৃষ্ণ সিংহের বাগানবাড়িতে গঠন করেন অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন নামক এক বিতর্ক সভা (১৮২৮ খ্রি.)। ডিরোজিও নিজে ছিলেন এর সভাপতি এবং ডিরোজিওর ছাত্র উমেশচন্দ্র বসু ছিলেন এর সম্পাদক। এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল ভারতের প্রথম ছাত্র সংগঠন। অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন অধিবেশনে সনাতন হিন্দুসমাজের জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা, পৌত্তলিকতার ওপর আলোচনা ও বিতর্ক চলত। অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকায় লেখা হয়, অক্সফোর্ডকেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবগুলি যে ভূমিকা পালন করেহিন্দু কলেজের ছাত্রদের নিয়ে গঠিত অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনও সেই ভূমিকা পালন করে।

বিভিন্ন পত্রপত্রিকা প্রকাশ : 

ডিরোজিওর অনুগামী ছাত্ররা পার্থেনন নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন (১৮৩০ খ্রি.)। এই পত্রিকায় তাঁরা হিন্দুসমাজের বিভিন্ন কুপ্রথাগুলির বিরুদ্ধে লেখা প্রকাশ করেন। হিন্দু কলেজের সহসভাপতি প্রাচ্যবাদী হোরেস হেম্যান উইলসন এই পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশের আগেই এটি বন্ধ করে দেন। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় পার্সিকিউটেড পত্রিকায়, মাধবচন্দ্র মল্লিক বেঙ্গল হরকরা পত্রিকায় হিন্দুসমাজের কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লেখেন। নব্যবঙ্গীয়দের প্রচেষ্টায় ‘সোসাইটি ফর অ্যাকুইজিশন অব জেনারেল নলেজ নামক এক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে (১৮৩৮ খ্রি.)। ডিরোজিও নিজেও একই লক্ষ্য নিয়ে হেসপেরাসক্যালকাটা লিটারারি গেজেটক্যালাইডোস্কোপ’ ইত্যাদি পত্রিকার সম্পাদনা করতেন। ডিরোজিওর অনুগামীরা ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বাংলা ভাষায় জ্ঞানান্বেষণ’ ইংরেজি ভাষায় এনকুয়েরারবেঙ্গল স্পেকটেটরহিন্দু পাইওনিয়ার’ নামক পত্রিকা প্রকাশ ও সাধারণ ‘জ্ঞানোপার্জিকা সভা (১৮৩৮ খ্রি.) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নব্যবঙ্গীয় আন্দোলনের ধারা বজায় রাখেন। ডিরোজিও রচিত ফকির অব জাংঘিরা, টু ইন্ডিয়া মাই নেটিভ ল্যান্ড কবিতাগুলিতে তাঁর ভারতপ্রেমের পরিচয় মেলে।

নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের অবসান: 

ডিরোজিওর মৃত্যুর পর থেকেই ক্রমশ নব্যবঙ্গ বা ইয়ংবেঙ্গল আন্দোলন উপযুক্ত নেতার অভাবে শ্লথ হয়ে পড়ে। ডিরোজিওর অনুগামীদের অনেকেই সমাজসংস্কারের পথ থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হন এবং প্রাচীন হিন্দুত্ববাদী ধর্মের সঙ্গে নিজেদেরকে অঙ্গীভূত করে নেন।

নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের সমালোচনা: 

নব্যবঙ্গীয়রা বিভিন্ন দিক থেকে সমালোচিত হয়েছেন:-

  • রক্ষণশীলদের প্রতিবাদ : নব্যবঙ্গীয়রা অতি বাড়াবাড়ির জন্য জনসমর্থন বা গণসহযোগিতা পাননি। কেষ্টদাস পাল এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন — বড়ো বড়ো কথা বলা এবং বাস্তবে কিছুই না করা ছিল নব্যবঙ্গীয়দের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সেসময়কার ওরিয়েন্টাল ম্যাগাজিন, সংবাদ প্রভাকর, সমাচার চন্দ্রিকা পত্রিকাতেও নব্যবঙ্গ আন্দোলনের বিরোধিতা করে লেখা বের হয়। রক্ষণশীল শহুরে পরিবারগুলি কলকাতার হিন্দু কলেজে তাদের সন্তানদের শিক্ষাদানের জন্য ভরতি করাতে দ্বিধাবোধ করেন।
  • আদর্শচ্যুতি: নব্যবঙ্গীয়রা পরবর্তী সময় তাদের আদর্শ থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছিল, যার ফলে তাদের আন্দোলন সফলতা পায়নি। বিনয় ঘোষের মতে — “নব্যবঙ্গীয়রা সুবিন্যস্ত আদর্শের ভিত্তিতে কোনো দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি
  • দৃষ্টিভঙ্গির অভাব: দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা নবাবলীয়দের উদ্দেশ্যকে সফল হতে দেয়নি। সুমিত সরকারের মতে—“নব্যবঙ্গীয়রা পাশ্চাত্য ভাবাদর্শের প্রভাবে অত্যাধুনিক বুর্জোয়া উদারনীতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলেও ঔপনিবেশিক শাসনে যে তার রূপায়ণ সঙ্কল নয় তা বুঝতে পারেননি”।
  • গঠনমূলক কর্মসূচির অভাব: গঠনমূলক কর্মসূচির অভাব নব্যবঙ্গীয় আন্দোলনকে সফল হতে দেয়নি। এই আন্দোলন শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ ভারতবাসীর সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। কেমব্রিজ ঐতিহাসিক ড. অনিল শীলের মতে—তারা গজদন্ত মিনারে বসবাস করত” (They lived in ivory towers)

উপসংহার :

ডিরোজিওর নেতৃত্বে নব্যবঙ্গীয় আন্দোলনকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা চলে না। নব্যবঙ্গীয়দের মধ্যে প্রথম পাশ্চাত্য সভ্যতা ও পাশ্চাত্য আদর্শের সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়েছিল। সাময়িকভাবে হলেও নব্যবঙ্গীয়রা ভারতবর্ষের সমকালীন সমাজব্যবস্থা, ধর্মনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিল। ঐতিহাসিক বিপানচন্দ্রের মতে—নববঙ্গীয়দের চিন্তাধারা আধুনিকতার নিরিখে রামমোহনের থেকেও প্রগতিশীল ছিল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘A Nation in Making’ গ্রন্থে লিখেছেন—“এরাই বাংলার আধুনিক সভ্যতার প্রবর্তক। এরাই আমাদের জাতির পিতাএদের গুণাবলি আমাদের কাছে স্মরণীয়।

Leave a Comment