ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ভারতীয় মুসলমান | Nana Ronger Itihas

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ভারতীয় মুসলমান | Indian freedom struggle and Indian Muslims

-মিরাতুন নাহার

রহমতুল্লাহ মোল্লা ২৪ পরগণা বিপ্লবী। রহিমউল্লাহ সুন্দরবন অঞ্চলের। শেষোক্তজন বাড়ীর মেয়েদের গয়না ভেঙে টুকরো করে গুলি হিসাবে ব্যবহার করেন ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত শত্রুর গুলিতে প্রাণ দেন। তাঁর স্ত্রীও তাঁর সহযোদ্ধা ছিলেন। তেজস্বিনী এইসব রমণীদের কথা আজ কেই-বা জানে!

সমগ্র পৃথিবীতে একটি দুর্ভাগা সম্প্রদায়ের নাম ভারতীয় মুসলমান। ভারতীয় মুসলমান যেন সোনার পাথরবাটি। পাথরবাটি সোনার হতে পারে না। মুসলমানও তাই। যে ভারতীয় নয়। বাঙালি নয়, দেশপ্রেমিক নয়, স্বাধীনতা সংগ্রামী নয় ….. সে কেবলই-কেবলমাত্র মুসলমান। স্বদেশবাসীর কাছে সে-ই তার একমাত্র পরিচয়। এদেশের শিক্ষক তার মুসলমান ছাত্রকে যখন বলেন, এদেশে রয়েছ কেন?’ তখন তিনি ভুলে যান দেশটি তাঁরও যেমন স্বদেশ, তাঁর ছাত্রটিরও তাই। এই ভুলে যাওয়া ব্যাধিটি বহু যুগ ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে এদেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ সম্প্রদায় প্রাপ্ত হয়ে আসছে। নিয়াময়ের কোন লক্ষণ নেই। চিকিৎসককুল ব্যর্থ।

দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই স্বাধীনতার বয়স হয়েছে ৭৫ বছর, নিয়ে উৎসবও হল। অথচ রবীন্দ্রনাথ-কথিত হিন্দু মুসলমানের মধ্যেকার বিচ্ছেদের ডোবা ভরাট হওয়া হল না। মুসলমান তাঁর স্বদেশবাসীর কাছে আজও ভারতীয় নয় এমনই সে হতভাগ্য। এদেশের জন্য তার ভালবাসা নেই। এদেশকে স্বাধীন করার জন্য তার কোন ত্যাগ নেই। স্বভূমে সে তাই পরবাসী। এমন দুর্ভাগা সম্প্রদায় আর কোথাও আছে?

তাই ভাবছিলাম, পাঠক সাধারণের কাছে কিছু সত্য তুলে ধরা প্রয়োজন। নির্জলা মিথ্যা দেশকে যে সর্বনাশের পথে ঠেলে দিচ্ছে। তার প্রমাণ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। দেশের পরাধীনতা মোচনে মুসলমানের কোন ত্যাগ নেই-এই মিথ্যাকে সত্য বলে চালনো হয়েছে বহুকাল। কিছু ক্ষীণকণ্ঠ সত্যভাষণে সোচ্চার হতে চেষ্টা করেও সফল হয়নি। তেমনই কিছু কণ্ঠে উচ্চারিত সত্য তথ্য পাঠক সাধারণের কাছে স্বল্প পরিসরে তুলে ধরাই এ লেখার মুখ্য উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা প্রচারই কেবল জয় হবে, ব্যর্থ হবে সকল মহান প্রয়াস একথা ঠিক নয়। বহুসংখ্যক মানুষের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কিছু প্রতিবাদী কণ্ঠ তুলে ধরেছে সত্য ইতিহাস। সে রকম কিছু টুকরো সত্য এখানে সাজিয়ে দেওয়া হলো-দেশের শৃঙ্খল মোচনে অগণিত ভারতীয় মুসলমানের আত্মত্যাগের নির্ভেজাল কিছু ঐতিহাসিক সত্য।

যুক্তিবাদী সত্যানুসন্ধানী গবেষক প্রয়াত অধ্যাপক শান্তিময় রায় স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কালকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করে নিয়ে প্রতিটি পর্যায়ে ভারতীয় মুসলমানের ভূমিকা অতি প্রাঞ্জল ভাষায় উল্লেখ করেছেন। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ হলো প্রাক্ জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগ। এই যুগের ফকিরবিদ্রোহ ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নেতা হলেন মজনু শাহ। পরপর কয়েকটি যুদ্ধে তিনি দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাস্ত করেন। অসম সাহসী এই বীর মানুষটি আমৃত্যু দেশের শত্রু ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ১৭৮৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয় অখ্যাত একটি গ্রামে যুদ্ধে আহত হওয়ার পর। ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী এমন বহু ভারতীয় মুসলমান দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণদান করেন। তাঁদের সংগ্রাম পরবর্তীযুগের আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

১৮২০ থেকে ১৮৭০ সাল ওয়াহাবি আন্দোলনের কাল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন এক অধ্যায়। এই আন্দোলনে প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সৈয়দ আহমদ ব্রেলভি নামে একজন ফকির। তিনি ফারাজী আন্দোলনের নেতা পীর সারিয়াতুল্লা এবং পীর নিসার আলির সঙ্গে একজোট হয়ে অবিচার এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য শোষিত জনসাধারণকে সংগঠিত করতে চেয়েছিলেন। এই সময়কালে উল্লেখযোগ্য সংগ্রামী হলেন তিতুমীর-ব -বারাসত বিদ্রোহের নায়ক। পরবর্তী সংগ্রামী হলেন দুদু মিয়া যিনি ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দে হিন্দু ও মুসলমান অত্যাচারী জমিদারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁর শত্রুপক্ষে যোগ দেয়। আমৃত্যু তিনি তাঁর লড়াই চালিয়ে যান। এরপর ১৮৫৭ সনের মহাবিদ্রোহে হাজার হাজার দেশপ্রেমিক যুদ্ধে প্রাণ দেয়। দশ সহস্র মানুষ ফাঁসিকাষ্টে অথবা কামানের মুখে মৃত্যুবরণ করেন। তারা অধিকাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত। এই মহাবিদ্রোহের একজন উল্লেখযোগ্য মুসলমান নেত্রী হলেন অযোধ্যার বেগম জেরত মহল । ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই-এ তিনি নিজে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। দুঃসাহসিকা এই রমনী তেজস্বিতার সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অবশেষে নেপালের নির্জন পার্বত্য অঞ্চলে মৃত্যুবরণ করেন।

১৮৫৭ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত জাতীয় চেতনার উন্মেষ যুগ। এই পর্যায়ের মুসলমান দেশপ্রেমিকদের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম হল হাজি ইমদাদুল্লাহ, রসিদ আহমেদ গঙ্গোবি, আবদুল রসুল, মৌলবি ইসমাইল সিরাজি, আবদুল আমেদ ইউসুফ জিলানি, মৌলবি হাসিমুদ্দিন আমেদ ও নবাব আমির হোসেন। এঁদের দেশপ্রেম ছিল নিখাদ সোনার মতো খাঁটি।

১৯০০ থেকে ১৯৩৪ সাল সশস্ত্র সংগ্রামের কাল অর্থাৎ স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিযুগ। এই যুগের খ্যাতনামা শহীদ কিশোর ক্ষুদিরামকে গ্রেপ্তারের আগে আশ্রয় দেন এক সাহসিকা মুসলমান রমণী। আব্দুল ওয়াহাব, মহমুদল হাসান, মহম্মদ আবদুল্লা, আহম্মদ আলি, ফতে মহম্মদ, মৌলবি আনসারি, ওবেদুল্লা, রসুলুল্লা খান, ইমতিয়াজ আলি, রুকনউদ্দীন এবং আরো অনেক মুসলমান দেশপ্রেমিক জীবনের সুখস্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শেষোক্ত তিনজন হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করেন। এই পর্বের একজন বাঙালী মুসলমান বিপ্লবী মকসুদ্দিন আমেদের নাম উল্লেখযোগ্য এবং নারী বিপ্লবী হলেন রিজিয়া খাতুন।

১৯১৯ থেকে ১৯৩৪ সাল জাতীয় গণ আন্দোলনের যুগ। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ও মৌলানা আক্রম খাঁ এই পর্বে সক্রিয় ভারতের দুজন মহান নেতা। মুজারুল রক, রফি আহমেদ কিদোয়াই, আবদুর রহিম, অধ্যাপক সেলিম, আবদুল রহমান, টিপু সুলতান, মুহম্মদ মুশা, ইয়াকুব হাসান, আবদুল গফ্ফার খান, মৌলানা হজরত মোহসিন, আবদুস সামাদ, ডাঃ আসফ আলি, আব্দুল মোমিন, হুমায়ুন কবির, রেজাউল করিম, ফকরুদ্দিন আলি আমেদ, মৌলানা ভাসানি, আবুল হায়াত, চৌধুরী আফজল হক, ফজলুল হক, মিঞা ইব্রাহিম সৈয়দ আবদুল্লা ব্রেলভি, সমরু আল্লা বাক্স ও আবদুস সামাদ খন এই পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য স্বাধীনতা সংগ্রামী। দেশের জন্য এঁদের আত্মত্যাগের তুলনা মেলা কঠিন। এঁদের সংগ্রামের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়ার স্থানাভাব। অতএব কেবল নামোল্লেখেই থামতে হবে।

ভারতীয় মুসলমানের একটি বিরাট সংখ্যক মানুষেরা বাঙালি মুসলমান। সত্যনিষ্ঠ গবেষক আবুল হোসেন বঙ্গবাসী বহু পরিশ্রম স্বীকার করে প্রস্তুত করেছেন বাঙালী স্বাধীনতা সংগ্রামী চরিতাভিধান। এই চরিতাভিধানে দৃষ্টি মেলে বিস্মিত হয়ে যাই। অসংখ্য বাঙালী মুসলমান তাঁর স্বভূমি ভারতবর্ষের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন বীরবিক্রমে। অতি সংক্ষেপে তাঁদের মধ্যেকার কিছু বিপ্লবীর নাম উল্লেখ করা হলো যাঁদের দেশপ্রেম সম্পর্কে অতি বড় নিন্দুকও সংশয়ী হতে পারেন না।

আলিউল্লা মহম্মদ (১৯০৪-১৯৭৮) চট্টগ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রামী। দেশকে ভালবেসে বহুবার কারাযন্ত্রণা ভোগ করেন। ওয়াজিদ আলি খান পন্নি (১৮৬৯-১৯৩৬) ময়মনসিংহের বিপ্লবী। দেশভক্ত এই মানুষটি জামিন পেয়েও জামিন না নিয়ে জেলে যান। মুর্শিদাবাদের খোন্দকার আলি আফজল (১৯২০-১৯৬৯) জাতীয় আন্দোলনের ঝাঁপিয়ে পড়েন ছোটবেলা থেকেই। আসামের জোবেদা খাতুন চৌধুরী (১৯০১-১৯৮৮) লবণ আইন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। সারা জীবন দেশ ও জনগণের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছিলেন। আসামের মৌলানা মুহম্মদ তাহের (১৯২০-১৯৯৪) ভারত ছাড় আন্দোলনের সক্রিয়া কর্মী ছিলেন। বগুড়ার দৌলতুন্নেসা স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেন, বহুবার কারাবন্দী হন। কলকাতার মাজিমুন্নেসা খাদ্য আন্দোলনে যোগ দেন। পূর্ববাংলার নিয়ামত আলি তেভাগা আন্দোলনে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। কুষ্টিয়ার পাপা মিয়া ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দে ফাঁসিতে প্রাণদান করেন। বরিশালের ফজলুল করিম কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্বদান করেন। কারাবরণ করেন। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন ফাতিমা জিন্নাহ। চট্টগ্রামের বদিউল আলম (১৮৫৬) স্বদেশী আন্দোলনে অংশ নেন, খেলাফত, অসহযোগ ও সত্যাগ্রহ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন, কারাযন্ত্রণা ভোগ করেন। বেগম শায়েস্তা ইকরামুল্লা, বেগম সাকিনা ফারুক, বেগম হামিদ আলি স্বাধীনতা সংগ্রামী তালিকায় বিশেষ কিছু নাম যাঁদের কথা কেউ জানে না বললে ভুল হয় না। ২৪ পরগণার কাজী মঙ্গলজানও এমন একটি নাম, দেশকে ভালবেসে ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করেন। মুর্শিদাবাদের মজলুম হোসেন (১৯১০-১৯৯৫), ময়মনসিংহের মজিদ মিয়ার আত্মত্যাগের কথা জানে না আজ কেউ, পূর্ববাংলার মনতাজউদ্দিন তেভাগা আন্দোলনের কর্মী। মনসুর আহম্মদ বার্লিনে গিয়েছিলেন সংগ্রামী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করার জন্য। স্বদেশী ডাকাতদলের নেতা মহম্মদ হায়াত। কুমিল্লার মনোয়ার আলি অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। ঢাকার মহিউদ্দিন চৌধুরী (১৯০৬-১৯৭৫) স্বাধীনতা-যোদ্ধারূপে খিলাফত আন্দোলনে যোগ দেন।

চট্টগ্রামের মাওলানা মনিরুজ্জমান ইসলামাবাদীকে (১৯৭৫-১৯৫০) উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখে বেত ও বুট দিয়ে আঘাত করা হয়। বয়স তখন তাঁর ৬৫ বছর। তবুও তিনি গোপন খবর ফাঁস করেননি। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমরা তাঁর নামটুকুও মনে রাখিনি। মাদার মোল্লা, মাসুম মহম্মদ ২৪ পরগণার মানুষ। প্রথমজন প্রত্যক্ষ সংগ্রাম করেন। দ্বিতীয়জন ফাঁসিবরণ করেন। ২৪ পরগণার মৌলভী মুজিবর রহমান (১৮৬৯-১৯৪০) খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেন। ত্রিপুরার মোখলেসুর রহমান, বরিশালের মোশারফ হোসেন বহু নির্যাতন ভোগ করেন।

পূর্ববাংলার রইসা বানু আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেন। ঢাকার রওশন আরা বেগম স্বদেশী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বহু নির্যাতনের শিকার হন। বরিশালের কৃষক আন্দোলনের নেতা রসিদউদ্দিন আততায়ীর হাতে প্রাণ দেন। রহমতুল্লাহ মোল্লা ২৪ পরগণা বিপ্লবী। রহিমউল্লাহ সুন্দরবন অঞ্চলের। শেষোক্তজন বাড়ীর মেয়েদের গয়না ভেঙে টুকরো করে গুলি হিসাবে ব্যবহার করেন ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত শত্রুর গুলিতে প্রাণ দেন। তাঁর স্ত্রীও তাঁর সহযোদ্ধা ছিলেন। তেজস্বিনী এইসব রমণীদের কথা আজ কেই-বা জানে! রাহিলা, রিজিয়া স্বাধীনতা সংগ্রামের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তাঁরা যেন আজ কাহিনী চরিত্রমাত্র। লিয়াকত হোসেন নির্ভীক স্বদেশী নেতা ছিলেন। বিপ্লবীদের আইন অমান্য আন্দোলন করতে শিক্ষা দিতেন। চট্টগ্রামের লোকমান খান শেরওয়ানি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেন। বগুড়ার শারাফত আলি, ফরিদপুরের শরিয়তউল্লাহ বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য নির্যাতন ভোগ করেন। সৈয়দ সামসুদ্দিন ছিলেন গুপ্তসমিতির সদস্য। ময়মনসিংহের সামউদ্দিন সশস্ত্র বিপ্লবী ছিলেন।

সাবেদা খাতুন ছোটবেলাতেই বিপ্লবী আন্দোলনে অংশ নেন। হুগলীর সিরাজুল হক আন্দামানে বন্দী ছিলেন। সুফিয়া ছিলেন নীল বিদ্রোহীদের সহকর্মী।

মকসুদা সুলতানা রংপুরের মেয়ে। শ্রমিক কর্মচারীদের বিপ্লবী আন্দোলনে ও ধাঙড় আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন। ডক্টর সৈয়দ হোসেন (১৮৮৮-১৯৪৯) কলকাতার মানুষ। তাঁর বিপ্লবী জীবন বর্ণময়। হোমরুল আন্দোলনের কর্মী এই মানুষটি দেশপ্রেম তাঁর জীবনের প্রতিকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে। বিপ্লবী তালিকায় তিনি এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব।

টাঙাইলের হাতিম আলি খান, সিলেটের হাদা মিয়া, হুগলীর হামিদুল হক, ময়মনসিংহের হালিমা দেশকে ভালবেসে বিপ্লবাত্মক কর্মকান্ডে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। বরিশালের হেলালউদ্দিন, ফরিদপুরের আলাউদ্দিন, যশোহরের আসাদউল্লাহ, মালদার মৌলানা আমিরউদ্দিন, নীল বিদ্রোহী – ইউসুফ, করম আলি, কুতুবউদ্দিন, মৌলানা কেরামত আলি, মামুদ খান, জাকির মণ্ডল, তোতা গাজী অশেষ কষ্ট স্বীকার করে দেশের প্রতি ভালবাসার প্রমাণ দিয়েছেন। নদীয়ার মুজিবর রহমান, পূর্ববাংলার মুনিম, চট্টগ্রামের রজব আলি, বীরভূমের রজন সেখ, চট্টগ্রামের দৌলত খাঁ শের, পূর্ববাংলার শাহেদুল্লাহ, নদীয়ার সামসুদ্দিন আমেদ, সুরাত আলি খাঁ, হুগলীর হামিদুল হক্-রা কখনও ভাবেননি তাঁদের দেশপ্রেমে একদিন সংশয় দেখা দেবে। তাঁরা জানতেন যে, দেশের জন্য প্রাণ দেওয়াই ধর্ম, কষ্ট স্বীকার করাই ধর্ম। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম তাঁদের সে অনুভবকে দমন করতে পারেনি। তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সংগ্রামে। তাঁদের দান তাই অবিস্মরণীয়।

ভারতবর্ষ একটি বিশিষ্ট দেশ। পৃথিবীর সমুদয় দেশের মধ্যে তার বিশিষ্টতা লক্ষণীয়। তার নীতি-বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। এই সুমহান নীতি তাকে অনন্য করে তুলেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই নীতির মর্ম ভুলে বৈষম্যকে বড় করে দেখে। ভারতীয় মুসলমান আজও যথার্থ অর্থে স্বদেশবাসী হল না এত ত্যাগ সত্ত্বেও। সে কারণে এতবড় তালিকা তুলে ধরে পাঠককুলের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে হল। বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব হল না। তবুও মনে করি, পাঠক-সাধারণের ভুল ভাঙাবার জন্য এটুকু তথ্যও অনেকখানি।

ভারতবর্ষের মূল আদর্শ ত্যাগের আদর্শ। সেই ত্যাগের আদর্শ অন্তরে নিয়ে এদেশেরই সন্তান মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ জীবনের জাগতিক সুখস্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে কঠোর শাস্তি বরণ করেছে। জীবন দিয়েছে অক্লেশে। পিছ-পা হয়নি। তারাও যে ভারতীয় এর থেকে বড় প্রমাণ আর কী চাই? তবু আশ্চর্য হতে হয়- এসব সত্য ঘটনা অপ্রকাশিত রাখা হয় সযত্নে। সব মুসলমান যেন পাকিস্তানস্রষ্টা এই মিথ্যে পাপের বোঝা বইতে হবে সকলকে। আজও এই নিয়ে বিতর্ক ওঠে সংবাদপত্রের পাতায় । আজও শুনতে হয় ভারতীয় মুসলমানকে – কবে এলেন (বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তান থেকে)? স্বদেশে সে আজও পরবাসীর মতই। সমস্ত ভারতীয় মুসলমানের জন্য এই সত্য বড় বেদনার। তবু এই সত্য কঠিন বাস্তব। মুশকিল হলে বিশ্ব কবির মতো একে ভালবাসতে পারা যায় কই !

আজ ত্যাগের আদর্শ ভুলে ভারতীয়রা ভোগবাদী দলে নাম লিখিয়েছে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বাণী অনুসরণ না করে মানুষ আজ ঐক্য ছিন্ন করে বিভেদ নীতির প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী । এটাই এখন বর্তমান ভারতবর্ষের চিত্র। ভারতীয় মুসলমানদের দুর্ভাগা বলে শুরু করেছিলাম। শেষে বলি – দুর্ভাগা আসলে ভারতবর্ষ নামের এই দেশটা। অনন্য সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সে যেন অভাগিনী কারণ তার সন্তানদের মধ্যেও শিক্ষিত-মূর্খের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রীর তকমা পরে শিক্ষিতের মুখোশ এঁটে হীন স্বার্থান্বেষী মূর্খের দল দেশটাকে জাহান্নমে নিয়ে চলেছে। সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত ৷ নতুন প্রজন্ম লক্ষ্যভ্রষ্ট। এই পতনোন্মুখ অবস্থা রুখবে কে? আমাদের সামান্যশক্তিতে তাই সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকা, সত্যকে প্রকাশ করা, সত্যকে আবৃত হওয়া থেকে উদ্ধার করা একান্ত কর্তব্য।

[PDF] ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন 

Reference: 

  1. -মিরাতুন নাহার. (2008, September 28). ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ভারতীয় মুসলমান. Natun Path Eai Samay, Sharatkalin Bisesh Songkha(28th Sep. 2008), 294–296.

ভারতের ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রাম | Nana Ronger Itihas
ভারতীয় মুসলমানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস | Indian History

Leave a Comment