ইতিহাস রচনায় সাহিত্যিক উপাদানের গুরুত্ব | Literary sources

উত্তরঃ-

ইতিহাস হল সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনের বিবরণী। অতীত সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল থেকেই ইতিহাসের সৃষ্টি। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস শব্দটি অতীতের প্রতিচ্ছবি অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক ভারতীয় ঐতিহাসিকগণ সাহিত্যগত ও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের ভিত্তিতে প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানসম্মত ও সামগ্রিক ইতিহাস রচনায় কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। সাহিত্যগত উপাদানকে দেশীয় ও বৈদেশিক সাহিত্য -এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

দেশীয় সাহিত্যিক উপাদান গুলিকে নিম্নলিখিত ভাবে ভাগ করা যায়-

  1. ব্রাহ্মণ্য ধর্মের গ্রন্থ সমূহ।
  2. বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের গ্রন্থ সমূহ।
  3.  ব্যাকরণ মূলক গ্রন্থ সমূহ।
  4.  রাজ বংশাবলি ও জীবন চরিত।
  5.  অন্যান্য মূল্যবান ধর্মনিরপেক্ষ কাব্য নাটক প্রভৃতি।

দেশীয় সাহিত্যিক উপাদানের গুন:-

1. ব্রাহ্মণ্য ধর্মের গ্রন্থ সমূহ:-

  • প্রাচীন সাহিত্য ও ধর্মশাস্ত্র গুলি থেকে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের বহু উপাদান পাওয়া যায়। ভারতের প্রাচীনতম সাহিত্য হল ‘বেদ’। এরমধ্যে ঋগ্বেদ হলো সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। বেদ মূলত চার প্রকার, যথা- ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব। প্রতিটি বেদ আবার চার ভাগে বিভক্ত – সংহিতা, ব্রাহ্মণ্য, আরণ্যক ও উপনিষদ। বেদ গুলি থেকে আমরা ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ভারতের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাস জানতে পারি।
  •  ভারতের দুটি প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত থেকে বহু ঐতিহাসিক উপাদান পাওয়া যায়। রামায়ণ ও মহাভারতে প্রাচীন ভারতবাসীর ধর্মচিন্তা, সামাজিক জীবনে বহু বিবরণ পাওয়া যায়।
  • পুরান গুলিও ভারতের ইতিহাস রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এগুলি থেকে-

(a) ঋক বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে রাজতন্ত্র গুলোর বংশ বিবরণী ও রাজাদের নাম জানতে পারা যায়।

(b) খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত পুরান গুলি ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে।

(c) বিভিন্ন রাজাদের সময়ের ঘটনাবলী পুরান গুলিতে বিবৃত আছে।

(d) পুরান গুলিতে রাজাদের যুদ্ধ ও ঋষিদের আধ্যাত্মিক উন্নতি বর্ণনার মাধ্যমে সেই সময়কার যুদ্ধ বিবরণী ও দার্শনিক তত্ত্ব বর্ণনা করে।

(e) পুরান গুলি ভারতীয় ভূগোলের বিবর্তনের ইতিহাস রচনার করতেও সাহায্য করে।

2. বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের গ্রন্থ সমূহ:-

বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থ গুলি প্রচুর তথ্য সরবরাহ করে থাকে। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ জাতক , দীপবংশ, মহাবংশ, অঙ্গওরনিকা এবং জৈন গ্রন্থ ভগবতী সূত্র, পরিশিষ্ট পার্বণ প্রভৃতি গ্রন্থাদিতে যথেষ্ট ঐতিহাসিক উপাদান নিহিত আছে।

3. ব্যাকরণ মূলক গ্রন্থ সমূহ:-

পাণিনির ” অষ্টাধ্যায়ী” ও পতঞ্জলি “মহাভাষ্য” হতে পরোক্ষভাবে নানা ঐতিহাসিক উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়।

4. রাজ বংশাবলী ও জীবনচরিত:-

সাহিত্যগত উপাদানের মধ্যে রয়েছে কিছু জীবনচরিত ও স্থানীয় উপাখ্যান। এর অন্তর্ভুক্ত হল কুষাণ যুগে অশ্ব ঘোষ রচিত ‘ বুদ্ধচরিত’ ও খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে রচিত ‘ হর্ষচরিত’। তাছাড়া উল্লেখযোগ্য হল বাকপতি গৌড়বহ কাব্য, বিলহন রচিত “ বিক্রমাস্কদেবচরিত্র” প্রভৃতি।

5. অন্যান্য মূল্যবান ধর্মনিরপেক্ষ কাব্য ও নাটক:-

ধর্মনিরপেক্ষ কাব্য ও নাটক সম্পর্কে প্রথমে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র উল্লেখ করা যায়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। মহাভাষ্য ও কালিদাসের নাটক মৌর্যত্তর ও গুপ্ত যুগের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র ফুটে ওঠে। অমিল ‘ সঙ্গম’ সাহিত্যে প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক সামাজিক ও বাণিজ্যিক ক্রিয়া-কলাপ এর বৃত্তান্ত বিবৃত হয়েছে।

বৈদেশিক সাহিত্যের গুন:-

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে বিদেশি সাহিত্যেরও এক বিশেষ ভূমিকা আছে। বৈদেশিক ভ্রমণকারীদের বৃত্তান্ত প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথা- গ্রিক ও রোমান ঐতিহাসিকদের প্রদত্ত বিবরণ এবং চিনা ভ্রমণকারীদের লিখিত বিবরণ। ভারত ইতিহাসের এমন অনেক ঘটনা আছে যার উল্লেখ কেবল বিদেশিদের রচনাতেই আছে, ভারতীয়দের রচনাতে নেই।

দেশীয় সাহিত্যিক উপাদানের সীমাবদ্ধতা:-

ভারতীয়গণ সাহিত্য, দর্শন, শিল্পকলায় উৎকর্ষ প্রদর্শন করলেও অতীত ঘটনা পরম্পরায় কোন দিক বিশ্বস্ত রেখে যায়নি। ফলে প্রাচীন গ্রিসে হেরোডোটাস ও থুকিডিডিস এবং প্রাচীন রোমে লিভি ও টেসিটাসের মত  ঐতিহাসিক আমারা ভারতে পাইনি। সেই কারণে দেশে সাহিত্যিক উপাদান গুলি থেকে ইতিহাস রচনায় কিছু সমস্যা আছে।

  • দেশিয় উপাদানগুলির বিষয়বস্তুর সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ আছে। ইতিহাসের এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন আক্রমনকারী শাসক ভারতবর্ষে এসেছেন। শুধু তাই নয়, তারা অন্য ধর্ম মতে বিশ্বাসীও ছিলেন। সেজন্য মূল গ্রন্থ গুলি সংস্করণ করে তথ্য বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
  • বৈদেশিক আক্রমণ কারীদের দ্বারা ভারতীয় মন্দির ও গ্রন্থাগার গুলো আক্রান্ত হয়েছিল। তাদের শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ গুলিকে বিনষ্ট বিকৃত করেছে।
  •  কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্য ধর্মগ্রন্থগুলোতে বর্ণিত ঘটনাক্রম বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থ গুলির সম্পূর্ণ বিপরীত। নির্ভুল ইতিহাস রচনা এটি একটি বড় সমস্যা।
  •  বেদ  গুলি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বটে, কিন্তু তাদের সঠিক সন, তারিখ বা রচনার সময়কাল সম্বন্ধে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। তাই এগুলো থেকে রচিত ইতিহাস সম্পূর্ণ নির্ভর যোগ্য নয়।
  •  রামায়ণ মহাভারতের রচনাকাল  ঐতিহাসিক সময়ের মধ্যে ঠিক করা কঠিন।
  •  পুরান গুলি নিম্নলিখিত সমস্যা তৈরি করে:-
  1. পুরান গুলি অত্যাধিক ধর্ম মূলক, তা থেকে ইতিহাস রচনার কঠিন ব্যাপার।
  2. পুরান গুলির লেখক শোনা কথার উপর ভিত্তি করে বেশিরভাগ রচনা করেছেন।
  3. পুরান গুলিতে দেওয়া বংশাবলি বংশানুক্রমিক ভাবে সাজানো ইতিহাস গত ভাবে সম্ভব নয়।
  4. পুরান গুলি যে সময় রচিত হয়েছিল এবং তাতে আলোচ্য বিষয় সেইসময়কার থেকে অনেক পূর্বেকার বর্ণিত হয়েছে। ফলে এতে বর্ণিত ঘটনাগুলির ঐতিহাসিক সত্যতা সন্দেহের মধ্যে থেকে যায়।
  •  সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে ভারতবর্ষের ভূ-প্রাকৃতিক  অবস্থার প্রভূত পরিবর্তন হয়েছে। অনেক নদীর গতিপথ পরিবর্তন করেছে, ফলে বৈদিক যুগের এবং আলেকজান্ডার আক্রমণের সময়কার স্থানগুলির সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা কঠিন ব্যাপার। একইভাবে প্রাচীন ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শহর পাটলিপুত্র কোন নদীর উপত্যকায় অবস্থিত ছিল, তাও বিতর্কের মধ্যে রয়ে গেছে। বৈদিক সাহিত্যে বহুচর্চিত সরস্বতী নদী আজও কোথাও নেই।

বৈদেশিক বিবরণীর সীমাবদ্ধতা:-

বিদেশিদের দ্বারা লিখিত উপাদান গুলিরও কিছু সমস্যা আছে:-

  • বেশিভাগ বিদেশী লেখক ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি কিছুই জানতেন না। ভারতীয়দের আচার-আচরণ, সামাজি রীতি-নীতি সম্পর্কে তাঁদের কোন ধারণা ছিল না।
  •  তারা ভারতবর্ষে দীর্ঘদিন না থেকেই সেগুলি লিখেছেন।
  •  অধিকাংশ গ্রীক লেখকরা কোন কথার উপর ভিত্তি করে তাদের লেখাগুলি লিখেছেন।

ফলে বিদেশিদের রচনাগুলি সম্পূর্ণ  ইতিহাসগত ভাবে সত্য নয়।

সর্বোপরি বলা যায়, আধুনিক ভারতে প্রাচীন কালের ইতিহাস রচনায় গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করেন ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিকরা। তাঁদের রচিত ঘটনাগুলি ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করেছে, কারণ তাঁদের এই ইতিহাস লেখার উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষা করা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেজন্য তারা ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতির উজ্জ্বল দিক গুলিকে হেয় প্রতিপন্ন  এবং অনেক ক্ষেত্রে বিকৃত করেছেন। এও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনা করা বা ঐতিহাসিক উপাদান সন্ধানে সমস্যা তৈরি করেছে।

 

Leave a Comment