[New] কোচবিহার রাজবাড়ীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস [A brief history of the palace of Cooch Behar] | Nana Ronger Itihas। PDF [Download]

(কোচবিহার রাজবাড়ী )


 কোচবিহার রাজবাড়ীর  সংক্ষিপ্ত ইতিহাস



কোচবিহার রাজপ্রাসাদ শুধু কোচবিহার নয়, গোটা উত্তরবঙ্গের গর্ব। মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের সময় এই প্রাসাদ নির্মাণ হয়। প্রাসাদটি দৈর্ঘ্যে ৩৯৩ ফুট ইঞ্চি, প্রস্থে ২৯৬ ফুট ইঞ্চি। ৫১,৩০৯ বর্গফুটের এই রাজপ্রাসাদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৮৭৯৮০ সালে। 





রোমান ইতালিয়ান স্থাপত্যের প্রভাবে নির্মিত রাজপ্রাসাদটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৮৮৭ সালে। মোট খরচ হয়েছিল লক্ষ ৭৭ হাজার শত টাকা। ভূমি থেকে . মিটার উপরে স্থাপিত এই প্রাসাদের মাথায়, দরবারগৃহের ঠিক উপরে রয়েছে এক বিশালাকার গম্বুজ। ধাতুনির্মিত এই গম্বুজটির উচ্চতা মাটি থেকে ১২৪ ফুট ১০ ইঞ্চি। স্টিলের প্লেট থাকায় গম্বুজটিতে কোনও জং পড়েনি। প্রাসাদে প্রবেশ করতেই দেখা যায় দরবারগৃহ। ৭২ ফুট/৬৫ ফুট ইঞ্চির বিশালাকার এই দরবারগৃহেই সে সময় রাজদরবার বসত। 





প্রাসাদের একতলায় বিলিয়ার্ড রুম, গ্রন্থাগার, অতিথিশালা, ভোজনকক্ষসহ ২৪টি কক্ষ। দ্বিতলে ১৫টি শয়নকক্ষ, ৩টি বৈঠকখানা, ৪টি তোশাখানা, ১১টি স্নানঘরসহ মোট ৪০টি কক্ষ রয়েছে। দক্ষিণ দিকের ঘরগুলিতে রাজারানি থাকতেন। দ্বিতলে নাচঘরও ছিল বলে জানা যায়। এই প্রাসাদে প্রকাশ্য সিঁড়ি ছাড়াও একাধিক গোল সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়িগুলি কোনওটি কাঠের, কোনওটি লোহার। বেশ কিছু সিঁড়ি গম্বুজের মধ্যে উঠে গিয়েছে। প্রাসাদের পিছন দিকে ছিল পাকশালা। সামনে বারান্দা লাগোয়া সুন্দর পোর্টিকো। গোটা রাজাপ্রাসাদ জুড়ে ছিল মেহগনি কাঠের আসবাবপত্র। প্রাসাদ নির্মাণের সময় প্রাথমিকভাবে এটি ত্রিতল ছিল। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন কোচবিহারে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে এর ত্রিতল ভেঙে যায়। প্রাসাদের অলংকরণে বেশ কিছু জায়গায় পোড়ামাটির অলংকরণ রয়েছে। একে বাফ কালার টেরাকোটা বলা হয়। অলংকরণে সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি।


প্রাসাদে রয়েছে রাজকীয় অস্ত্রাগার। এতে রয়েছে ৮টি ভাল ৩টি ভাঙা আলমারি, ৯৩টি বন্দুক পিস্তল, একাধিক ব্যবহৃত তাজা কার্তুজ, ২৯টি তলোয়ার ৪টি ঢাল। 






১৯৯৯ সালে ২৯ বছর বাদে প্রথম অস্ত্রাগারটি খোলা হয়েছিল। পরে ২০১১ সালের ২৪ অগস্ট তৎকালীন জেলাশাসক
এটি এএসআই-এর হাতে তুলে দেন। অস্ত্রাগারটি অবশ্য বন্ধই রয়েছে। রাজপ্রাসাদের সামনেই
রয়েছে ফুলের বাগান। রয়েছে অশ্বক্ষুরাকৃতি ঝিল। ১৮৮৯-৯০ সালে এই বাগানে কভার্ড টেনিস
কোর্টও ছিল। প্রাসাদের সিংহদুয়ারটি লোহার। এটিও অলংকৃত ও রাজপ্রতীকখচিত। গেটের দু’দিকে
দু’টি স্তম্ভে মার্বেল পাথরের হাতি ও সিংহের মূর্তি রয়েছে। প্রাসাদে ঢুকতেই চোখে পড়ে
দু’টি ছোট কামান। ১৮৬৩-৬৪ সালে ভুটান যুদ্ধের সময় কোচবিহার রাজ্যের উল্লেখযোগ্য অবদানের
জন্য ব্রিটিশ সরকার মহারাজ নৃপেন্দ্রনারায়ণকে দু’টি কামান উপহার দেয়। আগে আরও দু’টি
কামান এখানে রক্ষিত ছিল, বর্তমানে তা চিলারায় ব্যারাকের অভ্যন্তরে রয়েছে।




কোচবিহারের রাজাদের কোনও
উত্তরাধিকারী না থাকায় তাঁদের সব সম্পত্তি ভারত সরকারের হাতে চলে যায়। পরবর্তীতে
আর্কিয়োলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া কোচবিহার রাজপ্রাসাদ অধিগ্রহণ করে।আর্কিয়োলজিক্যাল
সার্ভে অব ইন্ডিয়া  ১৯৯৮ সালের ১৩ জুলাই প্রাসাদে
মিউজিয়ামের উদ্‌বোধন করে। সেখানে কোচবিহার রাজাদের ব্যবহৃত সামগ্রীসহ এই অঞ্চলের বসবাসকারী
জনজাতির পোশাক ও ব্যবহৃত সামগ্রীর নমুনা প্রদর্শিত রয়েছে। প্রাসাদের
নিচের তলার ৬টি দোতলায় একটি, মোট ৭টি কক্ষ নিয়ে এই মিউজিয়াম তৈরি করা হয়েছে।



প্রাসাদে ঢুকেই প্রথমে চোখে পড়বে বিশাল দরবার হল। এখানেই এক সময় বসত রাজ দরবার। মেঝেতে রয়েছে পাথরের রাজ প্রতীক। দেওয়াল জুড়ে চারিদিকে রাজপরিবারের সদস্যদের নানান সময়ের নানান বয়সের ফটোগ্রাফ। বিভিন্ন রাজারানির আবক্ষ মূর্তি। 


ডানদিকের দরজা দিয়ে বেরোতেই সিঁড়ির নিচে রাখা রয়েছে তিনটি বিভিন্ন আকারের লোহার সিন্দুক আর একটি হাতির মাথার খুলি। দ্বিতীয় গ্যালারিতে রয়েছে বিলিয়ার্ড রুম। যতদূর জানা যায়, এটি রাজবাড়ির ডাইনিং হল ছিল। এখানেই এখন দর্শকদের জন্য রাখা রয়েছে রাজাদের ব্যবহৃত বিলিয়ার্ড টেবিল। রাজপরিবারের ব্যবহৃত আয়না। আর রয়েছে মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ, জিতেন্দ্রনারায়ণ, মহারানি সুনীতি দেবী, ইন্দিরা দেবীর তৈলচিত্র সস্ত্রীক জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের ফটোগ্রাফ।

(সস্ত্রীক জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণ)

তিন চার নম্বর হল অ্যানথ্রপলজিক্যাল গ্যালারি। প্রথমটিতে রয়েছে রাভা, মেচ, পালিয়া, টোটো, রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের ব্যবহৃত পোষাক, গহনা, রান্না করার বিভিন্ন সরঞ্জাম, চাষবাসের সরঞ্জাম; যেমন হালি (লাঙ্গল), হাত বেড়া (হাত ছেনি) ইত্যাদি। তারা কী ধরনের ঘরে বসবাস করে তাও এখানে দেখানো হয়েছে। চার নম্বর গ্যালারিতে সাজানো রয়েছে এখানকার আদিবাসীদের মাছ ধরার জন্য ব্যবহৃত বাঁশের তৈরি বিভিন্ন রকম সরঞ্জামতাপাই (মাছ ধরার ফাঁদ), ডুলু (খলুই), পেইতুং (মাছ রাখার ঝুড়ি) ইত্যাদি। মাটির ঘট, পঞ্চপ্রদীপ। রয়েছে বাঘ, শয়তান, জাম্বুবান, রাক্ষস, রাবণ, চণ্ডী, বাঁশলী তারা সহ কাঠের তৈরি বিভিন্ন মুখোশ। আর রয়েছে বিভিন্ন প্রকার বাদ্যযন্ত্রবাঁশি, সানাই, গিয়ালিং (তুরী), একতারা, দোতারা, সারিন্দা, আক্রাই (ঢোল) ইত্যাদি। পাঁচ ছয় নম্বর গ্যালারিতে রয়েছে নানা সময়ের স্কাল্পচার। সপ্তমঅষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু করে দশমএকাদশ শতকের ব্রহ্মা, বিষ্ণু, সরস্বতী, দুর্গার স্যান্ড স্টোন কষ্টিপাথরের মূর্তি সাজানো রয়েছে এখানে।


কাঠের চওড়া সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে ডানদিকে গেলে সাত নম্বর গ্যালারি। এটির নাম রাজ গ্যালারি। নামের সঙ্গে সাযূয্য রেখেই এখানে রয়েছে রাজাদের ব্যবহৃত সোফা, একটি পুরুষদের জন্য ব্যবহৃত ড্রেসিং টেবিল, রাজ রাজেন্দ্রনারায়ণের তৈলচিত্র, বাইসনের মাথা। বিভিন্ন কাচের বাক্সের ভেতরে প্রদর্শিত রয়েছে কোচবিহার রাজাদের মুদ্রা তৈরি করার চারটি বিভিন্ন লোহার ছাঁচ, বিভিন্ন ওজনের বাটখারা, মহারানির চাপরাসদরে তকমা। কোচবিহার সেনাবাহিনীর সেনাপদক, রাজ কর্মচারীদের রয়াল সিল, রাজ পরিবারের সিলমোহর। রাখা আছে খাপ তলোয়ার। আর আছে কারুকার্য করা রূপোর চামচ, আয়না, তাগা, পায়েল দর্পন ইত্যাদি।

 




মিউজিয়ামটি শুক্রবার বাদে সপ্তাহের প্রতিটি দিন সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে। টিকিটের মূল্য ২৫ টাকা করে, বিদেশি দর্শকদের কিছুটা বেশি ২৫০ টাকা করে মাথাপিছু দিতে হবে। প্রাসাদের বাকি ঘরগুলো এখনও সাধারণ দর্শকের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। প্রাসাদের অস্ত্রাগারের প্রদর্শনও বন্ধ রয়েছে। 


আরও পড়ুন 

কামরূপে কোচ আধিপত্য

কোচ মুঘল সম্পর্ক

পঞ্চানন বার্মা


Reference

1.  Roy, M. (n.d.). Cooch Behar Rajbari, Cooch Behar Rajbari Museum. photograph, Cooch Behar.

2. Royal History of Cooch Behar. (n.d.). Retrieved June 7, 2022, from http://coochbehar.nic.in/htmfiles/royal_history.html

3. Wikimedia Foundation. (2021, December 26). কোচবিহার জেলা. Wikipedia. Retrieved June 7, 2022, from https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%9A%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B0_%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A6%BE

4. Saha, P. R. (Ed.). (2017). Cooch Behar. Akhon Dooars.

33.

2.0

।। আগ্রহী লেখকদের আহ্বান।।

আপনাদের মূল্যবান লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের। যেকোনোও সময়, যেকোনও দিন। আমরা প্রকাশ করবো।
বিষয়:-
বিজ্ঞানের আবিষ্কার,চলচ্চিত্র, খেলাধুলা, সভা-সমিতি, মনীষীদের জীবন, ধর্মান্ধতা, সামাজিক সংকট, কুসংস্কার বিরোধী, পলিটিক্যাল স্ক্যাম, পলিটিক্যাল ইস্যু, পলিটিক্যাল টেরোরিজম, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে এমন যেকোন বিষয়েই লেখা পাঠানো যাবে।

নির্দিষ্ট কোন শব্দ সীমা নেই।
WhatsApp করে লেখা পাঠান:- 8116447650

…. প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন আমাদের WhatsApp নম্বরে


Leave a Comment