[New] মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমি-রাজস্বব্যবস্থা [Murshidkuli Khan Land-Revenue System] | Nana Ronger Itihas

Discuss the main features of Murshid Quli’s land revenue administration. What were its significances?  

মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমি-রাজস্বব্যবস্থা সম্পর্কে যা জান ব্যাখ্যা কর।
[Explain the revenue system of Murshid Quli Khan.]
মুর্শিদকুলি খাঁর ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা বৈশিষ্ট্য
মুর্শিদ কুলি খানের রাজস্ব ব্যবস্থা

উত্তর : 

অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলার ইতিহাসে মুর্শিদকুলি খানের ভূমি-রাজস্ব এক বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। স্যার যদুনাথ সরকার তাঁকে, “A glorious civil servant” বলে অভিহিত করেছেন। মুর্শিদকুলি খান নিজস্ব দক্ষতার জোরে ঔরঙ্গজেবের প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। তাঁর রাজস্ব ও শাসন সংক্রান্ত তথ্য আহকাম-ই-আলমগিরি, সালিস উল্লাহের ‘তারিখ ই বাংলা’ এবং গুলাম হুসেনের ‘রিয়াস-উস-সালাতিন’ নামক গ্রন্থ থেকে পেয়ে থাকি।

১৭০০ খ্রীঃ মুর্শিদকুলি বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত হন। এই সময় বাংলার রাজস্বব্যবস্থা ছিল বিশৃঙ্খল। বাংলায় সরকারের খালিসা জমি না থাকায় রাজস্বের আয় দারুণভাবে হ্রাস পায়। মুর্শিদকুলি রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য দুটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্রথমত, তিনি সমস্ত কর্মচারীর জায়গীর বাজেয়াপ্ত করে সরকারের নিজস্ব জমি বা খালসায় রূপান্তরিত করেন। এই সমস্ত জায়গীরদারদের উড়িষ্যায় বদলি করা হয়। দ্বিতীয়ত, জায়গীরদারদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জমি থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য সেখানে নিলামের ভিত্তিতে ইজারাদারদের একটি চুক্তিপত্রের বিনিময়ে নিয়োগ করা হল। এই ইজারাদারদের সঙ্গে ফ্রান্সের আঠেরো শতকের ফার্মিয়াসদের তুলনা করা হয়। মুর্শিদকুলি খাঁর এই ব্যবস্থাকে ‘মালজামিনী’ বলা হয়। এর ফলে জমিদাররা তাঁদের জমি হারালেন না, তাঁরা এই ইজারাদারদের অধীনে রইলেন। প্রকৃতপক্ষে জমিদারেরা অলস, দায়িত্বহীন ও অবিবেচক হওয়ায় এদের মাথায় মুর্শিদকুলি ইজারাদারদের চাপিয়ে দেন। আস্তে আস্তে অনেক জমিদার তাদের জমিদারী হারায় এবং এই স্থান গ্রহণ করে ইজারাদাররা। এভাবে মুর্শিদকুলি বাংলায় এই নতুন ভূমিকেন্দ্রিক অভিজাত সামন্ত শ্রেণী সৃষ্টি করেন। এই সব ইজারাদারদের মধ্য থেকে পরে দীঘাপতিয়া, নাটোর, মুক্তাগাছা প্রভৃতি স্থানের বিখ্যাত জমিদার বংশের উদ্ভব হয়। তবে প্রাচীন জমিদাররা জমিদারী হারালেও তাদের জীবন নির্বাহের জন্য মুর্শিদকুলি ‘নান কর’ চালু করেন। নান কর ছিল নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিদান, যার আয়ে জমিদারদের সংসার নির্বাহ হত।

সেলিম আল্লা ও জেমস্ গ্রান্টের লেখা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করার পরই মুর্শিদকুলি বাংলায় এই ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। আবদুল করিমের মতে মুর্শিদকুলি বাংলার ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় বিরাট কোনো পরিবর্তন আনেননি। তিনি এই ব্যবস্থার কতকগুলি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, জমির উৎপাদিকা শক্তি, কৃষকের কর দানের ক্ষমতা ও সাধ্যের কথা চিন্তা করে মুর্শিদ ভূমি-রাজস্বের পরিমাণ স্থির করতেন। অর্থাৎ শুধুমাত্র রাষ্ট্রের আয়ের কথা নয় তিনি প্রজাদের স্বার্থরক্ষার দিকে নজর রাখতেন। সমস্ত জমি জরিপ করার পর রাজস্ব স্থির করা হত জমিদার ও আমির উভয়ই রাজস্ব আদায় করতেন। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে খুবই কঠোরতা ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত রাজস্ব প্রদান না করলে কঠোর শাস্তি পেতে হত। উদাহরণ হিসাবে রাজশাহীর জমিদার রাজস্ব দিতে গড়িমসি করায় তাঁর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠানো হলে ভয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। আবদুল করিম মনে করেন এই ধরনের ঘটনা মুর্শিদের বর্বরতার পরিচয় দেয় না। তবে যাই হোক করপ্রদানে তিনি জমিদার বা আমির কাউকেই ক্ষমা করতেন না সেবিষয়ে সন্দেহ নেই। মুর্শিদ মুসলমান জমিদারদের চাইতে হিন্দু জমিদারদের বেশি পছন্দ করতেন। কারণ তারা ছিলেন নম্র, ভিতু ও কর্তব্যপরায়ণ। সর্বোপরি হিন্দু জমিদাররা নিয়মিত নির্ধারিত রাজস্ব প্রদান করতেন। অন্যদিকে মুসলমান জমিদাররা ছিলেন প্রভাবশালী। তারা ঠিকমত রাজস্ব দিতেন না এবং তাঁদের মধ্যে মুর্শিদের নির্দেশ অমান্য করার প্রবণতা ছিল বেশি। মুর্শিদের রাজস্ব ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এই যে বছর শেষে চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশের জন্য যে পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত, সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কারণে ফসল না ফলালে খাজনা মুকুব করা হত। গ্রান্টের তথ্য থেকে জানা যায় যে নির্ধারিত রাজস্ব পুরোটা কোনোদিনই আদায় করা হত না। সম্ভবত উৎপন্ন শস্যের এক তৃতীয়াংশের বেশি কখনো রাজস্ব হিসাবে দাবী করা হত। না। সুতরাং মুর্শিদকুলি যে অত্যাচারী ছিলেন একথা বলা যায় না।

মুশিদকুলি রাজস্ব আদায়ের জন্য বাংলাকে ১৩টি চাকলায় ভাগ করেন। প্রতি চালা বল আদায়ের দায়িত্ব একজন আমিরের হাতে থাকত। মুর্শিদ রাজস্ব আদায়ের খরচ কমানোর জন্য বড়ো জমিদারী গড়ে তোলেন। তবে তাঁর সময়ে ছোটো জমিদারীর সংখ্যাও কম ছিল না। তা এন. কে. সিংহ মনে করেন, ছোটো জমিদাররী লোপ করে মুর্শিদ বড়ো জমিদারী গড়ে তোলেন এই অভিযোগ সবসময়ই সত্য নয়। কিন্তু বড়ো জমিদাররা যাতে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারেন সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হত।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মুর্শিদকুলি প্রবর্তিত ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এই নীতির মধ্য দিয়ে সরকার, জমিদার, প্রজা প্রত্যেকেই লাভবান হয়েছিলেন। রাজস্বের হার খুব বেশি না হওয়ায় কৃষকদের নিরাপত্তা ও কৃষির উন্নতি হয়েছিল। ঘুনাথ সরকারের মতে তার রাজত্বের শেষের দিকে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কারণ তিনি প্রশাসনিক ব্যয় সংক্ষেপ করেছিলেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ কমিয়ে তিনি প্রশাসনিক দক্ষতার চমকপ্রদ নজির তুলে ধরেছিলেন।

মুর্শিদকুলি খাঁ সম্পর্কে অভিযোগ করা হয় যে তাঁর রাজস্ব নীতির ফলে বাংলার জমিদারী ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি জমিদারদের ভরণপোষণের জন্য যে জমি বা নান করের ব্যবস্থা করেন পরে তার সঙ্গে জলকর ও বস্ত্রকর যুক্ত হয়। আধুনিক ঐতিহাসিকেরা এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে মনে করেন। তাঁদের মতে জমিদারী ব্যবস্থাকে তুলে দেবার কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কঠোরতা থাকলেও রাজস্বের পরিমাণ অতিরিক্ত ছিল না।

প্রকৃতপক্ষে মুর্শিদের আমলে জমিদারী ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নিয়মিত রাজস্ব প্রদান করলে সরকার জমিদারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন না। মুর্শিদ জমিদারী ব্যবস্থাকে জোরদার করার জন্য বড়ো বড়ো জমিদারী গঠনে উৎসাহী হন। এ বিষয়ে তিনি আংশিক সাফল্য লাভ করেছিলেন। তবে পরবর্তীকালে এইসব জমিদাররা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। এবিষয়ে রঘুনন্দনের নাম উল্লেখযোগ্য। সুতরাং মুর্শিদের আমলে বাংলার জমিদারী ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছিল একথা বললে সত্যের অপলাপ হবে।

সেলিম আল্লার বিবরণ থেকে জানা যায় জমিদার ও আমিনদের অত্যাচারের হাত থেকে প্রজাদের বাঁচানোর জন্য তিনি সবসময় চেষ্টা করতেন। রাজস্বের পরিমাণ কম থাকলেও সাধারণ মানুষের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। অর্থাভাবের জন্য জিনিসপত্রের দাম কম থাকলেও তা কেনার সাধ্য সাধারণ মানুষের ছিল না। যাই হোক কৃষি ও কৃষকদের উন্নতির জন্য মুর্শিদকুলি খাঁর সহৃদয় দৃষ্টি ছিল।

মুর্শিদের আমলে প্রজাদের মধ্যে একটা নিরাপত্তার ভাব ছিল ঠিক সময়ে খাজনা দিলে জমিদাররা তাদের উচ্ছেদ করতে পারত না। তবে জমিদাররা যে অন্যায় অত্যাচার করতেন না তা নয় মফস্বলের দিকে এই অত্যাচারের মাত্রা বেশ বেশি ছিল। জন সোরের মতে জমিদারদের অজ্ঞতা ও অক্ষমতাই ছিল এই অত্যাচারের কারণ।

একথা অনস্বীকার্য যে মুর্শিদের আমলে চাষীরা বেশ কষ্টেই ছিল। তিনি মুঘল সম্রাটকে নিয়মিত কর দিতেন। কাগজি মুদ্রার প্রচলন না থাকার মুর্শিদ রুপার টাকায় রাজস্ব দিতেন।ফলে বাংলায় রুপার ঘাটতি দেখা দেয়। স্টুয়ার্ট তাঁর “History of Bengal” গ্রন্থে ম্যান্ডোভিলের মন্তব্য উল্লেখ করেছেন যে, রুপার টাকায় রাজস্ব প্রদানের ফলে বাংলায় রুপার সংকট দেখা দেয়। নবাব হুণ্ডি করে রাজস্ব পাঠালে এত মুদ্রা সংকট দেখা দিত না। সরকারের প্রাপ্ত ভূমি-রাজস্ব পরিশোধের জন্য তারা বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে কম দামে ফসল বিক্রি করে মুদ্রা জোগাড় করতো। স্যার যদুনাথ সরকার বলেছেন, মুর্শিদকুলি মুর্শিদাবাদের ভূখণ্ডে ধনরত্ন সঞ্চিত করতেন, মুর্শিদাবাদের অভিজাত সমাজ যখন বিলাসে নিমজ্জিত, তখন গরিব কৃষকেরা কুড়েঘরে, পশুর মতন জীবন ধারণ করতে বাধ্য হয়। ভরতচন্দ্র তাঁর “অন্নদামঙ্গলে” যে ভিখারী শিবের বর্ণনা দেন তা ছিল আসলে অন্নহীন বাংলা কৃষকের নিপীড়িত আত্মা ৷ 

মধ্য ভারতের ইতিহাসের অন্যান্য বড় প্রশ্ন উত্তরঃ-

1. সুলতানীর পতন ও মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা

2. ইলতুৎমিসের কীর্তি

3. সুলতানি যুগের স্থাপত্য

4. ভক্তি আন্দোলন

5. শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা

6. শিবাজীকে কি মধ্যকালিন ভারতের সর্বশ্রেষ্ট

7. দাক্ষিণাত্য ক্ষত

8. আলাউদ্দিন খিলজি বাজারদর নিয়ন্ত্রণ

9. আকবরের রাজপুত নীতি

10. জায়গিরদারি সঙ্কট

Leave a Comment