[PDF] চোল শাসনব্যবস্থা || Chola administration

 

 

CBCS SYLLABUS OF CU(University of Calcutta), WBSU (WEST BENGAL STATE UNIVERSITY), KU (University of Kalyani), VU( Vidyasagar University), BU( The University of Burdwan), BKU (Bankura University), CBPBU (Cooch Behar Panchanan Barma Univirsity), NBU ( University of North Bengal), KNU ( Kazi Nazrul University), SKBU (Sidho – Kanho- Birsha University) etc. History Notes

 

What were the distinctive features of the Chola administration?
(চোল শাসনব্যবস্থার
বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা কর।)
চোল
শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো।
চোল
শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা কর
চোল স্বায়ত্তশাসন
ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য
চোলদের স্বায়ত্তশাসন
চোল শাসন
ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য

 

উত্তর: 

সাম্রাজ্যবিস্তার ব্যতীত চোলগণ শাসন বিষয়ে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। চোল শাসকদের অনুশাসন লিপি ও আরব গ্রন্থকারদের বর্ণনা থেকে চোল শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।
 
দক্ষিণ ভারতে বিভিন্ন রাজবংশের বিস্তৃতি ও তাদের সংখ্যাধিক্যের ফলে কেন্দ্রীয় শাসন পদ্ধতি প্রবর্তন করা সম্ভব ছিল না। চোল নৃপতিগণ সামস্তদের ক্ষমতা বিশেষভাবে খর্ব করে কেন্দ্রীয় শাসন শক্তিশালী করে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন। চোলশাসন ব্যবস্থায় কৃষক সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। চোল রাজারা ‘চক্রবর্তী’ উপাধি গ্রহণ করতেন। চোল নৃপতিগণ রাজার দৈবসত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। রাজপুরোহিত (রাজগুরু) ও অন্যান্য কর্মচারীদের পরামর্শ অনুসারে রাজা রাজ্যশাসন করতেন। কেন্দ্রীয় শাসনের সকল বৈশিষ্ট্য চোল রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় লক্ষ্য করা যায়।
 
চোল সাম্রাজ্য কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। প্রদেশগুলি ‘মণ্ডল’ নামে পরিচিত ছিল। প্রদেশগুলির কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। রাজ্যবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রদেশ বা মণ্ডলগুলির সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রতিটি মণ্ডল কয়েকটি কোট্টম বা বল নাড়ুতে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি কোট্টম আবার কতগুলি জেলা বা ‘নাড়’ তে বিভক্ত ছিল। কতগুলি গ্রাম্য সমবায় নিয়ে নাডুগুলি গঠিত ছিল। এই গ্রাম্য সমবায়গুলি ‘কুরম’ নামে পরিচিত ছিল। প্রতিটি মণ্ডলের ভারপ্রাপ্ত ছিলেন একজন রাজপ্রতিনিধি যিনি রাজার নিকট জবাবদিহি করতেন। সাধারণত রাজপুত্রগণই এই পদে নিযুক্ত হতেন। মণ্ডলের অধিপতিকে মণ্ডলেশ্বর বলা হত। মণ্ডলেশ্বরদের প্রধান কর্তব্য ছিল কেন্দ্রের অনুশাসন মেনে চলা। এবং মণ্ডলের যাবতীয় সংবাদ রাজার দৃষ্টিগোচরে আনা। মণ্ডলেশ্বর-এর অধীনে নিযুক্ত ছিলেন একদল কর্মচারী। রাজা ছিলেন সর্বোচ্চ শাসক চোল নৃপতিগণ ছিলেন জাঁকজমক প্রিয় এবং নানাবিধ উপাধি ধারণ করতেন। রাজপদ ছিল বংশানুক্রমিক। অবশ্য প্রয়োজনবোধে অনেক ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যাতিক্রম হত। রাজা সকল ক্ষমতার অধিকারী হয়েও স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না। এক সুসংবদ্ধ কর্মচারী গোষ্ঠীর দ্বারা প্রশাসন পরিচালিত হত। কর্মচারী নিয়োগের পদ্ধতি জানা যায় না। সম্ভবত উত্তর ভারতীয় রীতিনীতি অনুসারে কর্মচারী নিয়োগ করা হত। তবে যোগ্যতা, জন্মসূত্র ও সামাজিক মর্যাদা অনুসারে কর্মচারী নিয়োগ করা হত। প্রশাসন সম্পর্কিত যাবতীয় আদেশ প্রথমে রাজা মুখে মুখে দিতেন পরে নথিভুক্ত করে তা প্রচার করা হত। চোল প্রশাসনে রাজাকে সাহায্য করার জন্য নিয়মিত মন্ত্রী পরিষদ ছিল কিনা তা জানা যায় না তবে তাঁকে পরামর্শ দেবার জন্য এক বিশেষ কর্মচারী পরিষদ ছিল। প্রতিটি শাসন বিভাগের অধিকর্তাগণ সর্বদাই রাজার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। এবং শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দান করতেন। 
 


 
প্রদেশগুলির কয়েকটি প্রত্যক্ষভাবে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক শাসিত হত। প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতেন এবং রাজার নিকট সকল বিষয়ে দায়ী থাকতেন। প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের অধীনে বহু কর্মচারী নিযুক্ত থাকতেন।
 
রায়তী স্বত্ব ছিল দুই প্রকারের-  কোথাও গ্রামের গোষ্ঠীগত মালিকানা যেখানে গ্রামবাসী চুক্তিবদ্ধ রাজস্ব প্রদান করত। কোথাও কৃষক মালিকানা স্বীকৃত ছিল এবং কৃষকগণ সরাসরি রাজাকে রাজস্ব প্রদান করত। সকল ক্ষেত্রেই রাজস্বের পরিমাণ ছিল নির্দিষ্ট। এবং রাজস্ব প্রদানের পর উদ্ধৃত অংশ রায়তের ভোগে আসত। রাজাকে রাজস্ব দেওয়া ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে ভূমিস্বত্ব নিয়োগী ও মন্দিরকেও রাজস্ব দেওয়ার রীতি চোল সাম্রাজ্যে প্রচলিত ছিল। ব্রাহ্মণকে দান হিসাবে প্রদত্ত ভূমি ও দেবতার উদ্দেশ্য উৎসর্গীকৃত ভূমি করমুক্ত ছিল। এই দুইপ্রকার দান ব্রহ্মদেয় ও দেবদেয় দাম নামে পরিচিত ছিল। প্রজা অর্থাৎ যারা রাজস্ব প্রদান করতেন এবং কৃষিমজুর অর্থাৎ যারা তা করতেন না এদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য ছিল। কৃষিমজুর গ্রামীণ সভাগুলির সদস্য হবার অধিকারী ছিল না। এবং স্থানীয় সায়ত্ত্বশাসনের কোন দায়ীত্ব গ্রহণ করতে পারত না। প্রকৃতপক্ষে ভূমিহীন কৃষকদের অবস্থা ছিল ভূমিদাসদের ন্যায়। তাদের আর্থিক উন্নয়নের কোন আশা ছিল না। এদের অনেকে মন্দিরের জমিদারীতে অত্যন্ত নিম্ন কাজে নিযুক্ত হত। নিম্নবর্ণভুক্ত হওয়ায় মন্দিরে প্রবেশের অধিকারও তাদের ছিল না। জমির খাজনা, গ্রামীণ সত্তা ও মন্দিরগুলির দাতা আরোপিত আঞ্চলিক কর কৃষকদের উপর বোঝাস্বরূপ ছিল। এই করভার থেকে মুক্তি পাবার মাত্র দুটি উপায় ছিল – (১) কর ছাড়ের জন্য রাজার নিকট আবেদন করা অথবা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া। ভূমিরাজস্ব ছিল রাষ্ট্রের প্রধান আয়। সাধারণত উৎপাদিত ফসলের চার ভাগের এক অংশ রাজস্ব হিসাবে গৃহীত হত। রাজস্বের হার বেশী হলেও বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে তা আংশিক বা সামগ্রিক মুকুব  করা হত। জমি জরিপ করে ভূমিরাজস্ব নির্ধারণ করার রীতি চোল সাম্রাজ্যে প্রচলিত ছিল। আবাদী জমি, মন্দির, পুষ্করিণী, সেচখাল ইত্যাদি করমুক্ত ছিল। জলসেচের প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হত।
 
চোলদের সামরিক বাহিনী ছিল সুগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত। তারা একটি স্থায়ী বিশাল সৈন্যবাহিনী পোষণ করতেন। সামরিক বাহিনী তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল—পদাতিক, অশ্বারোহী ও হস্তীবাহিনী। সৈন্যগণকে উপযুক্ত সমরশিক্ষা দেওয়া হত। সমর নায়কগণ “নায়ক, ‘সেনাপতি”, “মহাদণ্ডনায়ক’ প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। চোল শিলালিপি থেকে জানা যায় যে ৭০টি রেজিমেন্ট নিয়ে চোল সেনাবাহিনী গঠিত ছিল। সমগ্র সৈন্যসংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ৫০ হাজার, হস্তীর সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার, অশ্বারোহী বাহিনীও ছিল সুগঠিত। পেশাদারী সৈনিক ছাড়াও প্রয়োজনের সময় তীরন্দাজ ও রণসেনা সংগ্রহ করা হত। ‘সেনাপতি’ ও ‘মহাদণ্ডনায়ক” যুদ্ধ পরিচালনা করতেন কিন্তু রাজাই ছিলেন সর্বোচ্চ সমর নায়ক। চোলরাজগণের নৌ-বাহিনীও শক্তিশালী ছিল।
 


 
চোল সাম্রাজ্যের শাসন পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্য গ্রাম্য স্বায়ত্বশাসন। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে স্বায়ত্তশাসন মূলক প্রতিষ্ঠান গঠিত ছিল। চোল কর্মচারীগণ গ্রামের সকল ব্যাপারে নিয়ত অংশগ্রহণ করতেন পরামর্শক হিসাবে। এর ফলে উচ্চমহলে রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও গ্রামীণ জীবনের ধারা ছিল অক্ষুণ্ণ। গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনের আদর্শ ছিল গ্রামীণ প্রশাসনে গ্রামবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ করা। এই উদ্দেশ্যে প্রতিটি গ্রামে গ্রামীণ সভা বা পরিষদ ছিল এবং সভার হাতেই প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল। আয়তনে বড় বড় গ্রামগুলিতে একাধিক গ্রামীণ সভা ছিল এবং একজন গ্রামবাসী নিজের প্রয়োজন অনুসারে এক বা একাধিক গ্রামীণ সভার সদস্য হতে পারত। এক একটি গ্রাম কয়েকটি ওয়ার্ড বা পল্লীতে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি পল্লীর নিজস্ব সভা ছিল। বিভিন্ন বৃত্তিধারী লোকেরা পল্লীসভায় যোগ দিত। সাধারণ সভার অন্তর্ভুক্ত ছিল স্থানীয় অধিবাসীবৃন্দ। সাধারণ সভা ছিল তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত—যথা—উর’, ‘সভ্য’ ও ‘নগরম’।
 
গ্রামীণ শাসনকার্যে গ্রামীণ সভাগুলি ছিল সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, সরকারী খাজনা আদায়ের দায়িত্ব গ্রামীণ সভাগুলি পালন করত। কোন কোন সময় বিশেষ প্রয়োজনে সভাগুলি নতুন কর ধার্য করার অধিকারী ছিল, যথা—কৃষির জলসেচের জন্য কূপ খনন বৃহদাকার সভাগুলি নিজস্ব বেতনভুক্ত কর্মচারী নিযুক্ত করার অধিকারী ছিল। অবশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রামীণ কর্মচারীগণ ছিল অবৈতনিক স্বেচ্ছাসেবী।
 
গ্রাম্য সভার উপর কৃষিজমির জরিপ, রাজস্ব আদায়, বিরোধ নিষ্পত্তি, ও শিক্ষাবিস্তারের ভার ন্যস্ত ছিল। কৃষি ছাড়া কুটির শিল্পগুলি গ্রামবাসীদের অর্থনৈতিক জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ করত। কুটির শিল্পগুলি গ্রামবাসীদের চাহিদা পূরণ করত। এককথায় গ্রামগুলি ছিল স্বয়ংশাসিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাষ আবাদ, বস্ত্রবয়ন ইত্যাদি প্রয়োজনীয় সকল কিছু গ্রামবাসীরা নিজেরাই করত। পণ্যসামগ্রী উদ্বৃত্ত না হওয়ায় অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে লেনদেনের কোন সমস্যা ছিল না। নগরবাসীর প্রয়োজন মেটাবার জন্য গ্রামে পণ্যসামগ্রীর উৎপাদনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এবং নগদ মূল্যের বিনিময়ে এই সকল পণ্যসামগ্রী নগরে পাঠাবার রীতি প্রচলিত হয়। এর ফলে চোল সাম্রাজ্যে মুদ্রার বহুল প্রচলন শুরু হয়।
 
চোল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সুগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত। এটি পূর্ববর্তী পল্লব যুগের ধারাকে পূর্ণতা দান করেছিল। এই কারণে চোল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে স্মিথ বলেন যে, “The administrative system was well-thought and reasonably efficient” বিশেষত, চোলদের গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত আধুনিক মননশীলতার পরিচায়ক।

Leave a Comment