স্পেনের গৃহযুদ্ধ | Spanish Civil War

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
Instagram Group Join Now

Write a Critical note on Spanish Civil War | স্পেনের গৃহযুদ্ধের উপর একটি সমালোচনামূলক নোট

স্পেনের গৃহযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ | Summary of the Spanish Civil War

স্পেনের গৃহযুদ্ধের সূচনা:

স্প্যানিশ আর্মাডার পতনের (১৫৮৮ খ্রি.) পর স্পেনের গৌরব ধীরে ধীরে ম্লান হতে শুরু করে। ১৯ শতক নাগাদ স্পেন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক দ্বিতীয় শ্রেণির শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় আর শেষ হয় ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে। গৃহযুদ্ধে জয়ী হয়েছিল ফ্যাসিস্ট একনায়ক জেনারেল ফ্রাঙ্কোর দল। আর পরাজিত হয়েছিল নির্বাচিত সরকার অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রী দল। ঐতিহাসিক ই. এইচ. কার স্পেনের গৃহযুদ্ধকে ইউরোপের গৃহযুদ্ধ বলেছেন।

স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপট:

১) প্রজাতান্ত্রিক দলের ক্ষমতালাভ:

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে আলকালা জামোরা-র নেতৃত্বে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্রী দল প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে। প্রজাতান্ত্রিক সরকার আর্থসামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রগতিশীল সংস্কার চালু করে। যেমন-i) চার্চের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সেগুলি কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা, ii) শিল্প সংগঠনগুলিকে রাষ্ট্রায়ত্ত করা, iii) সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করা, iv) চার্চের পরিচালনাধীন বিদ্যালয়গুলি বন্ধ করা ইত্যাদি।

২) দক্ষিণপন্থীদের ভূমিকা:

ফ্রান্সের দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি অর্থাৎ যাজক, রাজতন্ত্রী ও অভিজাতবর্গ প্রজাতন্ত্রের অবসান ও রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। অপরদিকে সে সময়কার ফ্রান্সের উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী সিন্ডিক্যালিস্ট ও কমিউনিস্টগণ সোভিয়েত রাশিয়ার অনুকরণে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। এমতাবস্থায় ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে উদারতন্ত্রী দল পরাজিত হয়। ক্যাথোলিক ও ব্যবসায়ীদের মিলিত দল ক্যাথোলিক পপুলার অ্যাকশন পার্টি জয়যুক্ত হয়। ক্ষমতা পেয়েই এরা প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পূর্বপ্রবর্তিত বিভিন্ন সংস্কার বাতিল করে দিতে শুরু করে। ফলে প্রজাতান্ত্রিকরা তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। প্রেসিডেন্ট আলকালা জামোরা বাধ্য হয়ে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে পুনর্নির্বাচনের আদেশ দেন।

৩) পপুলার ফ্রন্টের ভূমিকা:

১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে সমাজতান্ত্রিক, বামপন্থী, প্রজাতান্ত্রিক, সাম্যবাদী এবং নৈরাজ্যবাদী সিন্ডিক্যালিস্টরা এক জোট হয়ে পপুলার ফ্রন্ট গঠন করে। নির্বাচনে এই ফ্রন্ট জেতে এবং জোটের সমাজতান্ত্রিক দল সবথেকে বেশি আসন পায়। ফ্রন্টের তরফে প্রেসিডেন্ট হন ম্যানুয়েল আজানা, আর প্রধানমন্ত্রী হন স্যানটিয়াগো কুইরোগা। পার্লামেন্ট জামোরাকে পদচ্যুত করে আজানাকে প্রেসিডেন্ট করে। এরপর থেকেই দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থীদের সংঘাত চরম রূপ ধারণ করে।

৪) সেনাবাহিনীর ক্ষোভ:

গোটা দেশ জুড়ে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপকরতে হয়। জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা কয়েকটি সেনাদলের সঙ্গে মিলিত হয়ে স্পেনীয় মরক্কোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। ফ্রাঙ্কো এরপর মরক্কো থেকে দক্ষিণ স্পেনে চলে এলে প্রজাতন্ত্রী সরকার ও বামপন্থীরা তাকে বাধা দেয়, শুরু হয় স্পেনের গৃহযুদ্ধ।

ইউরোপীয় যুদ্ধে রূপান্তর:

গৃহযুদ্ধটি স্পেনের মাটিতে হলেও এটির ইউরোপীয় গৃহযুদ্ধে রূপান্তর ঘটেছিল। স্পেনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সঙ্গে আসলে মিশে গিয়েছিল আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের রেশ। সমকালীন ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই গৃহযুদ্ধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাই ডেভিড টমসন বলেছেন-ইউরোপে গণতন্ত্র বনাম একনায়কতন্ত্রের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলেছিল তারই প্রতিফলন ঘটেছিল স্পেনের গৃহযুদ্ধে। যে কারণে গৃহযুদ্ধটি আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছিল সেটি হল-মুসোলিনি আবিসিনিয়া জয়ের পর পশ্চিম ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে ইতালির অবস্থানকে আরও দৃঢ় ও স্থায়ী করার জন্য গৃহযুদ্ধকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁর লক্ষ্য ছিল স্পেনের নৌঘাঁটিকে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা। অনুরূপভাবে জার্মানিও সাম্যবাদ প্রতিরোধে স্পেনের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিতে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেয়।

স্পেনের গৃহযুদ্ধে বিদেশি হস্তক্ষেপ:

স্পেনের গৃহযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই ইতালি ও জার্মানি বিদ্রোহীদের সমর্থন করেছিল। ইতালি দেড় লক্ষ সেনা পাঠায় এবং জার্মানি ট্যাংক, বন্দুক, কামান ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে বিদ্রোহীদের সাহায্য করে। তুলনায় স্পেনের সরকার সেরকমভাবে বিদেশিদের কাছ থেকে সাহায্য পায়নি। স্পেনের সরকার তৎকালীন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী লিও ব্লুম এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বল্ডউইনের কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হয়। কেন না ব্রিটেন ও ফ্রান্স স্পেনের গৃহযুদ্ধ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।

স্পেনের গৃহযুদ্ধের বর্ণনা:

জাতীয়তাবাদী সমর্থকগণ মাদ্রিদ, ভ্যালেন্সিয়া, ক্যাটালোনিয়া-এসব অঞ্চলে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুললে গৃহযুদ্ধ ভয়ংকর রূপ নেয়। স্পেনের সরকার বাধ্য হয়ে স্পেনের রাজধানী ভ্যালেন্সিয়া থেকে বার্সেলোনায় স্থানান্তরিত করে। প্রাণসংশয় দেখা দিলে স্পেনের প্রেসিডেন্ট আজানা প্যারিসে পালিয়ে গেলে সরকারি সেনারা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। স্পেনের প্রতিক্রিয়াশীল সব শক্তি এসময়ে ফ্রাঙ্কোর পাশে দাঁড়ায়। স্পেনীয় সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদাধিকারী জেনারেল মিয়াজা স্পেনবাসীর কাছে শান্তির জন্য আবেদন রাখেন। এদিকে মাদ্রিদে কমিউনিস্টরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। চারিদিকে শুরু হয় নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড। সেনাপতি মিয়াজা মাদ্রিদ ছেড়ে চলে যান।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ গুরুত্ব:

স্পেনের গৃহযুদ্ধের গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

  1. ফ্যাসিবাদী শক্তি বৃদ্ধিতে: ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে স্পেনে ফ্যাসিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক আঙিনায় ফ্যাসিবাদী জোট আরও শক্তিশালী হয়।
  2. সমর দক্ষতা যাচাইয়ে: জার্মানি ও ইতালি এই গৃহযুদ্ধ থেকে ফায়দা লোটে। হিটলার এই গৃহযুদ্ধে যোগ দিয়ে তাঁর বিমানবাহিনীর দক্ষতা ও মারণাস্ত্রের ক্ষমতা যাচাই করে নেন।
  3. পাশ্চাত্য দেশগুলির সাম্যবাদ ভীতিতে: এই যুদ্ধ প্রমাণ করে পাশ্চাত্য দেশগুলি ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের চেয়েও সোভিয়েত সাম্যবাদকে বেশি ভয় করে।
  4. জার্মানি-ইতালি সম্পর্ক: এই গৃহযুদ্ধ জার্মানি ও ইতালির সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করে, যার ফলশ্রুতি রোম-বার্লিন অক্ষচুক্তি।
  5. জাতিসংঘের ব্যর্থতায়: স্পেনের গৃহযুদ্ধে জাতিসংঘের হতাশাজনক ভূমিকায় এর ব্যর্থতাই ফুটে ওঠে।

উপসংহার:

স্পেনের গৃহযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকর রূপটি প্রকাশ পায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ প্রায় নিশ্চিত এটাও বোঝা যায়। এই গৃহযুদ্ধে ইউরোপের প্রায় সকল দেশই জড়িয়ে পড়ায় একে Stage rehearsal of the Second World War বলা হয়।

PDF – স্পেনের গৃহযুদ্ধ | Spanish Civil War

Leave a Reply