[New] শিবাজী [Shivaji] | শিবাজীকে কি মধ্যকালিন ভারতের সর্বশ্রেষ্ট সৃজনশীল প্রতিভা বলা যায় । Nana Ronger Itihas। PDF [Download]

শিবাজীকে কি মধ্যকালিন ভারতের সর্বশ্রেষ্ট সৃজনশীল প্রতিভা বলা যায়?

[Can Sivaji be called the greatest creative genius of medieval India?]

শিবাজীর শাসন ব্যবস্থা বিশ্লেষণ কর।

[Analyze Sivaji’s regime.]

শাসক হিসেবে শিবাজীর কৃতিত্ব নিরূপণ কর।

[Determine Shivaji’s achievements as a ruler.]

উত্তর:- সতেরো শতকের ভারতবর্ষে যেসব আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটে, মারাঠারা ছিল তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য। শিবাজী ছিলেন মারাঠা শক্তির এই উত্থানের প্রধান নায়ক।
তাঁর নেতৃত্ব, রণকুশলতা, সাংগঠনিক শক্তি এবং সহজাত রাজনৈতিক প্রতিভা শতধা বিভক্ত মারাঠাদের এক স্বাধীনচেতা ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করে। তিনি যে কেবল যোদ্ধাই ছিলেন তাই নয়, সংগঠক ও সুশাসক রূপেও তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
(১) কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা: ভারতের চিরায়ত রাষ্ট্রনীতির কাঠামোকে বজায় রেখে শিবাজীর শাসন কার্য পরিচালিত হত।
(ক) রাজা: রাজা ছিলেন কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার প্রধান। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন রাজা। প্রকৃতপক্ষে শিবাজী ছিলেন একজন প্রজাহিতৈষী ও স্বৈরাচারী রাজা। তবে স্বৈরাচারী হলেও শিবাজী স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না।
শিবাজীর রাজত্বকালে শাসন পরিচালনায় রাজাকে সাহায্য করার জন্য অষ্টপ্রধান বা আট জন বিশিষ্ট একটি মন্ত্রী পরিষদ গঠিত হয়। এই আটজন মন্ত্রীরা হলেন যথাক্রমে- পেশোয়া (প্রধানমন্ত্রী), অমাত্য (রাজস্ব মন্ত্রী), সামন্ত (পররাষ্ট্রমন্ত্রী), পণ্ডিতরাও (রাজপুরোহিত), ন্যায়াধীশ (প্রধান বিচারপতি), সচিব (সরকারি পত্রলেখক), ওয়াকিয়ানবীশ (বিবরণ লেখক), সেনাপতি (সামরিক বিভাগের মন্ত্রী)। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, অনেক ঐতিহাসিকের মতে, মন্ত্রীরা ছিলেন শিবাজীর বিশ্বস্ত অনুচর মাত্র, তাঁদের পরামর্শ দেওয়ার কোন ক্ষমতা ছিল না।
(২) প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা: শাসন ব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য শিবাজী সমগ্র রাজ্যকে তিনটি প্রান্ত বা প্রদেশে বিভক্ত করেন। প্রতিটি “প্রান্ত”কে কয়েকটি “তরফে” ভাগ করেন। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে তরফ গঠিত হত। প্রদেশ গুলির শাসনভার ছিল একজন শাসনকর্তার অধীনে, তাঁকে বলা হত মামলত্দার। প্রত্যেকটি প্রদেশে কয়েকটি পরগনা বা তরফে বিভক্ত ছিল, পরগনা বা তরফের শাসনকর্তা কে বলা হত হাবিলদার বা কারকুন। শাসন ব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তরে ছিল গ্রাম। গ্রামের শাসনভার ছিল ‘দেশপান্ডে’ দেশমুখ ও কুলকার্ণির নিয়ন্ত্রণে।
(৩) রাজস্ব ব্যবস্থা: দাক্ষিণাত্যে মালিক অম্বর প্রবর্তিত রাজস্বনীতির অনুকরণে শিবাজী জমি জরিপ করে উৎপন্ন ফসলের ভিত্তিতে রাজস্ব ধার্য করতেন এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকেই রাজস্ব সংগ্রহ করতেন।
উৎপন্ন ফসলের এক-তৃতীয়াংশ, পরে এক-পঞ্চমাংশ রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হত। প্রজারা শস্যের পরিবর্তে নগদ অর্থেও খাজনা দিতে পারত। ভূমি রাজস্ব ছাড়া রাজ্যের অধিকৃত অংশ থেকে চৌথ বা রাজস্বের এক-চতুর্থাংশ ও সরদেশমুখী বা রাজস্বের এক-দশমাংশ দাবি করতেন।
(৪) সামরিক সংগঠন: রাজস্ব ব্যবস্থার পাশাপাশি সামরিক সংগঠনের ক্ষেত্রেও শিবাজীর সাংগঠনিক প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। প্রথম অবস্থায় মহারাষ্ট্রের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী মাওয়ালী জাতিকে গেরিলা যুদ্ধে প্রশিক্ষণ দিয়ে শিবাজী তাঁর সেনা বাহিনী গঠন করেন। পরে তাঁর সেনাবাহিনী অশ্বারোহী, পদাতিক বাহিনী ও নৌবাহিনীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া শিবাজী একটি গোলন্দাজ বাহিনীও গঠন করেন।
তাঁর অশ্বারোহী সেনাবাহিনী বারগীর ও শিলাদার এই দুই অংশে বিভক্ত ছিল। বারগীর বা নিয়মিত বাহিনী সরকার থেকে বেতন, বর্ম, ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র পেত। অন্যদিকে শিলাদার শুধুমাত্র যুদ্ধের সময় বেতন পেত। অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কে সর্নোবৎ বলা হত। এছাড়া তিনি ২০০ টি জাহাজের এক নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। শিবাজীর অধীনে প্রায় ২৪০টি দুর্গ ছিল। এই দুর্গ গুলো ছিল তাঁর সামরিক ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র। শিবাজী সেনাবাহিনীতে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা প্রবর্তন করেন। সেনাদের ছাউনিতে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।
(৫) বিচারব্যবস্থা: শিবাজী ধর্ম নিরপেক্ষ ভাবে বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করতেন। শিবাজীর অন্যতম ও সমালোচক কাঁফি খাঁ ও শিবাজীর বিচারব্যবস্থা ও ধর্মীয় উদারতার প্রশংসা করেছেন।
মূল্যায়নঃ শিবাজীর শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে ঐতিহাসিক পরস্পর বিরোধী মত প্রকাশ করেছেন। ডক্টর যদুনাথ সরকার শিবাজীর শাসনব্যবস্থাযর ভূয়সী প্রশংসা করে তাঁকে একজন সৃজনশীল প্রতিভা সম্পন্ন শাসক বলে অভিযোগ করেছে। অপরদিকে অধ্যাপক সতীশচন্দ্র তাঁর শাসন ব্যবস্থায় কোন মৌলিকত্ব খুঁজে পান নি। এরই সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক স্মিথ, ঈশ্বরী প্রসাদ, ফ্রায়ার প্রমুখরা তাঁর শাসন ব্যবস্থার নিম্নলিখিত দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেছেন, যেমন:
প্রথমত, এই শাসনব্যবস্থা রাজার ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পরবর্তীকালে যোগ্য নেতার অভাবে শাসনব্যবস্থায় শিথিলতা দেখা দেয়।
দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্য বিস্তারে অতিরিক্ত মনোযোগী হওয়ায় শিবাজী কৃষি ও শিল্পের উন্নতির দিকে তেমন দৃষ্টি দেননি, তাই তাঁর রাজত্বকালে মহারাষ্ট্রের অনগ্রসর অর্থনীতির তেমন কোনো উন্নতি ঘটে নি।
তৃতীয়ত, প্রতিবেশী রাজ্য থেকে জোর করে ‘সরদেশমুখি’ ও ‘চৌথ’ আদায়ের প্রথা চালু করে মারাঠাদের মধ্যে লুন্ঠনের প্রবৃত্তির সৃষ্টি করেন।
পরিশেষে বলা যায়, শিবাজী মারাঠা জাতিকে উদ্দীপিত করে তুললেও মহারাষ্ট্রের সামাজিক জীবনের কোন রূপান্তর ঘটাননি। এর ফলে শিবাজীর পক্ষে সমাজের সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।
উপরুক্ত দুর্বলতা সত্ত্বেও শিবাজীর শাসন ব্যবস্থা ছিল ধর্মীয় সহনশীলতা ও প্রজাহিতৈষণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের মতে, ‘শিবাজী যে শুধু মারাঠা জাতির স্রষ্টা ছিলেন এমন নয়, তিনি ছিলেন মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান জাতীয় স্রষ্টা’ (Shivji was not only the maker of the Maratha nation, but also the greatest constructive genius of the mediaeval India)

Leave a Comment